যশোরের ক্রীড়াঙ্গন থেকে আরো একটি নক্ষত্রের প্রস্থান না ফেরার দেশে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের লুৎফর রহমান

0
234

ডি এইচ দিলসান : যশোর তথা এ দেশের ক্রীড়াঙ্গন থেকে আরো একটি নক্ষত্রের প্রস্থান হল। সেই নক্ষত্র হলেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য ছাড়াও মুজিব নগরে গঠিত বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক লুৎফার রহমান। সোমবার (২৯ জুন) সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে তিনি জাগতিক সব মোহ কাটিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। এদিকে তার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব কবিরসহ যশোরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ক্রীড়া সংগঠকরা।
আছরবাদ মরহুমের জানাজা শেষে নিজগ্রাম ঘুরুলিয়া তালবাড়িতে তার দাফন করা হয়। উল্লেখ্য দীর্ঘদিন ধরেই প্যারালাইজড অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন লুৎফর রহমান।২০১৮ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ব্রেইন স্ট্রোক করার পর থেকে নিজ বাড়িতেই ছিলেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অন্যতম এ সদস্য। প্যারালাইসিস হয়ে যাওয়া ৬৯ বছর বয়সী লুৎফর রহমানের চিকিৎসা হচ্ছিল না ঠিকমতো। গত বছরের ১৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লুৎফর রহমানের চিকিৎসা এবং অন্যান্য সহযোগিতা বাবদ ৩০ লাখ টাকা প্রদান করেছিলেন। লুৎফর রহমানের স্ত্রী মাজেদা রহমানের হাতে পাঁচ লাখ টাকার চেক এবং ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র তুলে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। লুৎফর রহমানের বাসা যশোর শহরের লোন অফিস পাড়ায়। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে যশোরে নিজের বাসাতেই শয্যাশায়ী ছিলেন। তিনি এক পুত্র ও এক কন্যার জনক। নিজে ফুটবলার হলেও লুৎফর রহমানের একমাত্র ছেলে তানভীর খেলছেন ক্রিকেট।
একজন লুৎফর রহমান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশ স্বাধীনের বহু আগেই বিদেশের মাটিতে দেশের জাতীয় সংগীতের সাথে সাথে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মুক্তিযুদ্ধের পে জনমত গঠন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে ফুটবল নিয়ে যে ৩৬ জন খেলোয়াড় দেশ বিদেশে ছুটে বেড়িয়েছেন, তাদেরই অন্যতম সদস্য লুৎফর রহমান। মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের অহংকার যশোরের লুৎফর রহমান এ জাতিকে মুক্তির স্বাদ এনে দিতে সহযোগিতা করেছেন। একটি স্বাধীন মানচিত্র রচনার জন্য সহযোগিতা করেছেন। ১৯৫১ সালে জন্মগ্রহণকারী লুৎফর রহমান ছোটবেলা থেকে ফুটবল এবং হকি খেলায় আগ্রহী এবং পারদর্শী ছিলেন। যশোর জিলাস্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালীন তিনি স্কুলের এক খেলায় শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের পুরষ্কার পান। সে ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত যশোর জেলা ফুটবল দলের হয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া তিনি ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্থান বোর্ড দলের পে পশ্চিম পাকিম্থানের সম্মিলিত বোর্ডের বিরুদ্ধে খেলেছিলেন। ১৯৬৯ সালে ‘ঢাকা ওয়ারী কাব’যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালে দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে রাশিয়ার মিনস্ক ডায়নামো ফুটবল দলের বিরুদ্ধে খেলায় অংশ গ্রহণ করেন।
এর আগে যখন স্বাধীনতা যুদ্ধের ডামাডোলে যখন বাংলাদেশের তরুণ সমাজের সিংহভাগ নিজের মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার ল্েয পাকিস্থানী শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলছিলো, ঠিক তখনই খেলার মাঠের এ নায়ক বেছে নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আরেক কৌশল , স্বাধীনতা সংগ্রামে গ্রহণ করেছিলেন এক অনন্য সাধারণ নজিরবিহীন অত্যুজ্জ্বল ভূমিকা। যুগে যুগে দেশে ব্যতিক্রমধর্মী ভূমিকা তাতে দিয়েছে নবতর আঙ্গিক, নবতর সংযোজন। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সপে জনমত সৃষ্টিসহ খেলোয়াড়দের ডাক দিয়ে সংঘবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন মুষ্টিমেয় কয়েকজন তরুণ- আলী ইমাম, প্রতাপ, প্যাটেল, জাকারিয়া পিন্টু, আশরাফ, হাকিম এবং মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান এবং আরো অনেকে- স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠিত হলো। তারপর ভারতের বিভিন্ন স্থানে ১৬টি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে ভারতীয় মুদ্রায় ৩ ল টাকা তৎকালীন বাংলাদেশের অস্খায়ী সরকারের কাছে দিয়েছিলেন তারা। ১৬টি খেলার মধ্যে এই দল ১২টি খেলায় এ দলটি জয়লাভ করে। এবং বাকি ৪টির ৩টিতে পরাজয়, ১টিতে ড্র হয়’। এই টিমের সব থেকে গৌরবময় খেলাটি ছিল ২৪ জুলাই ভারতের কৃষ্ণনগরে নদীয়া স্টেডিয়ামে। ঐদিন ছিলো স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম খেলা। খেলোয়াড়রা আগেই সিদ্ধন্ত— নিয়েছিলো যে, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে তারা মাঠ প্রদণি করবে। এরপর মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সঙ্গীতের তালে তালে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার সাথে সাথে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে হবে। বিষয়টি নদীয়া ক্রীড়া সমিতিকে যথাসময়ে অবহিত করা হয়। এই খেলাকে উপল্য করে নদীয়ার কৃষ্ণনগরে ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের পোস্টার শহরের উল্লেখযোগ্য স্থানসমূহে শোভিত হয়। নানা মাধ্যমে শহর জুড়ে ব্যাপক প্রচার চলে। স্বাধীন বাংলা বেতার মারফত খেলার বিষয়ে অবহিত হয়ে কুষ্টিয়া জেলা থেকে উৎসাহী ক্রীমামোদীরা বিপুল সংখ্যায় মাঠে সমবেত হলেন। কিন্তু ঝামেলা হলো বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজানো ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন নিয়ে। ভারতের সরকার তখন পর্যন্ত— প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। বিভ্রান্তির মধ্যেই খেলার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলো। নদীয়া জেলা একাদশ মাঠে উপস্থিত। কিন্তু পতাকা ও জাতীয় সংগীতের বিষয়ে নিষ্পত্তি ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা ফুটবল দল মাঠে নামবে না কিছুতেই। অবশেষে নদীয়ার জেলা প্রশাসক স্বত:প্রণোদিত হয়ে ভারত ও বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত বাজানোর বিষয়ে সম্মত হলেন। পিন্টু-প্রতাপের হাতে ধরা মানচিত্র খোচিত বটল গ্রীন পটভমিতে লাল সূর্য বুকে নেয়া বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা দল ‘জয় বাংল’ গগণবিদারী ধ্বনির মাঝে মাঠ প্রদণি করলো। আবেগ বিহ্বল অশ্রুসজল নয়নে প্রতিটি বাঙালি খেলোয়াড় পতাকাকে চুম্বন করলেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ সংগীতের মূর্ছনায় ভারতের জাতীয় পতাকার সমর্যাদায় উত্তোলিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। একটি গর্বিত জাতির সমৃদ্ধ ইতিহাসে সোনালী অধ্যায় সূচিত হলো।
এই খেলার মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা প্রথমবারের মতো বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে অন্য একটি স্বাধীন দেশের পতাকার সমমর্যাদায় উত্তোলিত হয়। এ ঘটনার পর নদীয়ার জেলা প্রশাসক সাময়িকভাবে বরখাস্থ হন এবং নদীয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার এ্যাফিলিয়েশন বাতিল করা হয়। কিন্তু এ সংস্থার নজিরবিহীন ঘটনা রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের বিপুলভাবে উৎসাহিত করে মুক্তিযুদ্ধের অনুকূলে সুদূরপ্রসারী প্রভাব সৃষ্টি করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here