যশোর জেনারেল হাসপাতালের বেসরকারি খাত থেকে আয়ের কোটি টাকা কোথায়!

0
672
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল

শহিদুল ইসলাম দইচ/জি এম অভি : যশোর জেনারেল হাসপাতালের বেসরকারি খাত থেকে আয়ের একটি বড় অংশ লুটপাট করছে একটি সিন্ডিকেট। রোগীদের কাছ থেকে সেবার বিনিময়ে যেসব খাত থেকে অর্থ নেওয়া হয়, সেসকল বিভাগের কতিপয় কর্মচারী ও হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার যোগসাজসে চলছে এ লুটপাট। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বছরে কোটি কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে ওই চক্রটি। বৃহত্তর যশোরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার মানুষ যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নেন। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল
অফিসার (আরএমও) ডাক্তার আরিফ আহম্মেদ বলেন, এই অঞ্চলের মধ্যে যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার মান খুবই ভালো; সে কারণে বৃহত্তর যশোরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অনেক রোগী আসে। সেই রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন দেড় হাজারের মতো, অনেক সময় কম-বেশিও হয়। গত একমাসের তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে টিকিট সংগ্রহ করে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন ২৮ হাজার ৮৪১ জন। পাঁচ টাকার টিকেটে ওই খাত থেকে হাসপাতালের আয় হয় প্রায় এক লাখ ৪৪ হাজার ২০৫ টাকা। এছাড়া, গত এক মাসে জরুরি বিভাগের মাধ্যমে রোগী ভর্তি করে আয় প্রায় ৭৬ হাজার ৩১০ টাকা। এছাড়া চিকিৎসাসেবা নিতে আসা এসব রোগীর রোগ নির্ণয় করতে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করাতে দেন চিকিৎসকরা। হাসপাতাল থেকে
ওই পরীক্ষা করাতেও সেবাগ্রহীতাদের অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এসব পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে সিবিসি/পিবিএফ, এস.ক্রিয়েটিনাইন, ইএসআর/আরবিএস/২এইচএবিএফ, এসজিপিটি/এএলটি, এসজিওটি/এএসটি, এস.বিলিরুবিন, লিপিড প্রোফাইল, এস.ইউআরইএ, এস.ইউরিক এসিড, ইউরিন আর/এম/ই,

এস.ইলেকট্রোলাইট, ইউডাল/এফ.এনটিজেন, এএসও টাইটার/ আরএ/ সিআরপি, এইচবিএসএজি/আরএ/ সিআরপি, এইচবিএসএজি/ এইচআইভি/ এইচসিভি। এছাড়া ইসিজি, আল্ট্রাসনো, সিটিস্ক্যান, এক্স-রে পরীক্ষা করা হয় হাসপাতালটিতে। এসব পরীক্ষায় সরকার নির্ধারিত ফি নেওয়া হয়। সূত্র মতে, প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও ভর্তিকৃত প্রায় ৭০০ রোগীর পরীক্ষা করা হয় হাসপাতালের ল্যাবে। এ থেকে যে অংকের টাকা আয় হয়, তা
সরকারিখাতে জমা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে রসিদ ছাড়াই টাকা নিয়ে এসব পরীক্ষা করাচ্ছে একটি চক্র। সেইসাথে বহির্বিভাগে রোগীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে টিকিট দেওয়া হলেও তার অধিকাংশ রেজিস্টারভুক্ত করা
হয় না। সূত্র জানায়, ওই চক্রে রয়েছে বহির্বিভাগের টিকিট প্রদানকারী মফিজুল ইসলাম মফিজ, এক্স-রে ও
আল্ট্রাসনো বিভাগের মৃত্যুঞ্জয়, সিটিস্ক্যান বিভাগের নূরুজ্জামান, ইসিজি বিভাগের দীপক, অপারেশন থিয়েটার বিভাগের রহিমা, পেয়িং বেডের ঝুমুর, শাহানা, ফাতেমা। এ চক্রটি সরাসরি হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. দিলীপকুমার রায়ের আশীর্বাদপুষ্ট। সূত্র মতে, এজন্য তত্বাবধায়ক আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ডিসেম্বর মাসের আয়ের বিবরণ থেকে জানা যায়, ওই মাসে বেসরকারিখাত থেকে মোট আয় সাত লাখ ৪৪ হাজার ৩৪০ টাকা। এরমধ্যে এক্সরে বিভাগ থেকে আয় ১৫ হাজার ৪১০ টাকা, ইসিজি থেকে ৪৮ হাজার ৮৮০ টাকা, আল্ট্রাসনো থেকে আয় ৮৬ হাজার ৩৫০ টাকা, প্যাথলজি থেকে আয় এক লাখ ৫৩ হাজার ৯০০ টাকা, সিটিস্ক্যান থেকে আয় ৬২ হাজার টাকা, ইকো থেকে আয় ৪০০ টাকা, অ্যাম্বুলেন্স থেকে এক লাখ ১২ হাজার ৭০ টাকা, জরুরি বিভাগ থেকে ৭৪ হাজার ৭০০ টাকা, বহির্বিভাগ থেকে এক লাখ ৩৮ হাজার ৯৩০ টাকা ও কেবিন থেকে আয় ৫১ হাজার ৭০০ টাকা। হাসপাতালের হিসাব বিভাগের তথ্য মতে, ডিসেম্বর মাসে বহির্বিভাগে টিকিট কিনেছেন ২৭ হাজার ৭৮৬ জন। এসব রোগী বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকদের কাছ থেকে চিকিৎসাপত্র নিয়েছেন।

অর্থোপেডিকস বিভাগের চিকিৎসক শেখ মোহাম্মাদ আলী জানান, প্রতিদিন গড়ে দেড় শতাধিক রোগী দেখা হয় তার বিভাগে। এসব রোগীর ৬০ শতাংশের বেশি রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়া হয়।
সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন গড়ে অর্ধশত রোগী দেখেন তিনি। এর মধ্যে শতভাগ রোগীকেই রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দেন এবং তা হাসপাতাল থেকে করাতে বলা হয়। রিপোর্ট পাওয়ার পরই চিকিৎসাপত্র দেওয়া হয়। মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক শারমীন সুলতানা জানান, প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন রোগী দেখেন তিনি। এর ভেতরে ৬০ শতাংশ রোগীর রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা দেওয়া হয়। এদিকে, জরুরি বিভাগের ইনচার্জ এম আব্দুর রশিদ জানান, প্রতিদিন গড়ে দুই শতাধিক রোগী বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়। ওই সমস্ত রোগীর ৬০ শতাংশকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক চিকিৎসাসেবা দেয়
হাসপাতালের চিকিৎসকরা। হাসপাতালের তথ্য মতে, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগের মাধ্যমে গড়ে
মাসে সাড়ে ৩৩ হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবা নেন। যার মধ্যে ৬০ শতাংশ অর্থাৎ, প্রায় ২০ হাজার রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়। এসব রোগীর পরীক্ষার জন্য গড়ে ৫০০ টাকা করে খরচ হলেও হাসপাতালের
আয় হওয়ার কথা প্রায় এক কোটি ৫০ হাজার টাকা। অথচ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আয় দেখাচ্ছে মাসে মাত্র সাড়ে সাত লাখ টাকা। অর্থ তছরুপের বিষয়ে জানতে চাইলে প্যাথলজি বিভাগের গোলাম মোস্তফা বলেন, অর্থের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারবো না। সুপার স্যার আমাদের যেভাবে চালান আমরা সেভাবে চলি। এ নিয়ে বেশি
ঘাটাঘাটি করার দরকার নেই। এক্স-রে ও আল্ট্রাসনো বিভাগের মৃত্যুঞ্জয় বলেন, সাংবাদিকদের এতো
মাতামাতি কেন? রসিদ দেই বা না দেই তাতে আপনাদের কী? একপর্যায়ে তিনি বলেন, ভাই ছোট চাকরি করি, এদিকে তাকানোর দরকার কী!

জানতে চাইলে হাসপাাতলের তত্ত¡াবধায়ক ডাক্তার দিলীপকুমার রায়  বলেন, হাসপাতালে আমি বা অন্য কেউই অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িত না। এখানে অনিয়ম করার সুযোগও নেই। কারণ বছরে এক-দুইবার অডিট হয়। এরপরও কেউ অনিয়ম-দুর্নীতি করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, ভাই আমার আর চার মাস চাকরি আছে, ঝামেলা করবেন না। সম্মানের সাথে যেতে চাই।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here