ডেঙ্গু: শিশুদের জন্য কোভিডের ‘চেয়েও বিপজ্জনক’

0
43

যশোর ডেস্ক : “ডেঙ্গুজ্বর না হলে হয়ত এখন আমি আমার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আদর করতাম, স্ত্রীকে নিয়ে সুন্দর সময় কাটাতাম। অথচ ডেঙ্গু সবকিছু তছনছ করে দিল।” দুঃসহ এক অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন রাজধানীর উইলস্ লিটল ফাওয়ার্স স্কুলের মনিটরিং অফিসার মোসলেহ উদ্দিন তরুণ। এইডিস মশবাহিত এই রোগে মাসখানেক আগে তিনি নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও অনাগত সন্তানকে হারিয়েছেন। গত ১৪ জুন হঠাৎ জ্বর আসে তরুণের স্ত্রী ফাতেমা বেগমের, ১৬ জুন রিপোর্টে ধরা পড়ে ডেঙ্গু; ততণে রক্তে প্লেইটলেটস নেমে আসে ১৮ হাজারে। এরপর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাকে। প্লেইটলেটস দেওয়ার পরও অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে নেওয়া হয়। ২০ জুন পেটেই তার সন্তান মারা যায়। ২৬ ব্যাগ রক্ত দিয়েও বাঁচানো যায়নি ফাতেমাকে। তরুণ মনে করেন, তাদের শান্তিনগরের বাসার পাশের ময়লার স্তূপের পাশে জমা পানি থেকেই এইডিস মশার বিস্তার ঘটেছে। “এখানে প্রতিদিন অনেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। আমার শিার্থী বাচ্চাটাও আক্রান্ত হয়েছে। ডেঙ্গু করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর। ৬ দিনে আমার সংসারটা লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার থাকলে, নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটালে হয়ত আমাকে সব হারাতে হত না।” করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে শিশুদের সামনে বিপদ হয়ে আসছে ডেঙ্গু, কোভিড-১৯ রোগের তুলনায় যেটিকে শিশুর জন্য বেশি ঝুঁকির বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, শেষ পর্যায়ে রোগী আসায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। আর করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই পরিস্থিতিতে রোগ নির্ণয়ে দেরি হওয়ায় ডেঙ্গু রোগীদের বেশি ভুগতে হচ্ছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণেও জ্বর যেমন হয়, ডেঙ্গুতেও তাই হয়। করোনাভাইরাস আর ডেঙ্গুর জোড়া প্রকোপে ব্যাপক মৃত্যু ঠেকাতে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও এইডিস মশার বংশবিস্তার থামাতে জোর দিতে বলছেন তারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি পদপে হিসেবে সব হাসপাতালে নির্দেশনা পাঠানো হচ্ছে। শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকায় ১৬৪ জন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ঢাকার ৪১টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সর্বমোট ৬৭৯ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। চলতি বছর ডেঙ্গু সন্দেহে ৪টি মৃত্যুর তথ্য এসেছে আইইডিসিআরে। বছরের প্রথম ৬ মাসে ৩৭২ জন রোগী হাসপাতালগুলো চিকিৎসা নিয়েছেন। যেখানে জুলাই মাসেই হাসপাতালে এসেছেন ২ হাজার ৯০ জন ডেঙ্গু রোগী। বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। সে বছর আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়ালেও ২০২০ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটা কম ছিল। গত বছর ১ হাজার ৪০৫ জন রোগী হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নেন। চলতি মাসেই ডেঙ্গুতে এর চেয়ে বেশি রোগী আক্রান্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্যের উপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। রেকর্ড ছাড়াচ্ছে ডেঙ্গু চাপ বাড়ছে হাসপাতালে ঢাকার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, গত কয়েকদিন ধরে এইডিস মশাবাহিত এই ভাইরাস জ্বরে যেভাবে আক্রান্ত রোগী বাড়ছে, তাতে অনেক শিশুও পাচ্ছেন তারা। জ্বর, মাথা ব্যথা, চোখে ব্যথা, শরীরে ব্যথা, মুখ থেকে রক্তরণ, পেট ফুলে যাওয়া, শরীরে পানি আসা, গায়ে র‌্যাশ ওঠা- এসব লণ নিয়ে শিশুরা হাসপাতালে আসছে। দেশে এখন দ্বিতীয় সর্বাধিক ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে ধানমণ্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, শুক্রবার পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতালটিতে ৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। তবে সেন্ট্রাল হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের ইনচার্জ ও কনসালটেন্ট সুজিত কুমার রায় জানান, এই সংখ্যা ৯০ এর বেশি হবে, যার প্রায় অর্ধেকই শিশু। তিনি বলেন, “গত এক সপ্তাহে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেক বেড়ে গেছে। আমাদের এক সপ্তাহ আগে ১০ থেকে ১২ জন ডেঙ্গু রোগী ছিল। গত তিন দিনে পেডিয়াট্রিকে ৪০ জনেরও বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। আর মেডিসিনে ৫০ জনের মতো ডেঙ্গুরোগী রয়েছে।”সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকা রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক কাজী মো. রশিদ উন নবী জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যে ৯৬ জন রোগী ভর্তি ছিল, তাদের ১২ জন শিশু। এছাড়া চার দিন আগে ডেঙ্গু ‘শক সিনড্রোম’ নিয়ে আসা ১১ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে টেস্ট করার আগেই। “জ্বর নিয়ে বেশি রোগী আসছে। যারা আসছেন, তাদের প্লেইটলেটস কম থাকে। আমরা ট্রিটমেন্ট দিচ্ছি, কিন্তু রোগীর সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে।” সরকারি তথ্যের তুলনায় রোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে ধারণা এই চিকিৎসকের। রশিদ উন নবীর পরামর্শ, জ্বর এলে ডেঙ্গুর টেস্ট করে চিকিৎসকের পরামর্শে চলতে হবে। জ্বরের সঙ্গে বমি বা পেটে ব্যথা থাকলে অথবা হাত-পায়ে পানি আসলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত অহনা বিনতে মনির তিন দিন ধরে ঢাকার কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। বৃহস্পতিবার হাসপাতালের বেডে শুয়ে মায়ের হাত ধরে থাকতে দেখা যায় তাকে। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভিডেঙ্গু আক্রান্ত অহনা বিনতে মনির তিন দিন ধরে ঢাকার কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। “ডেঙ্গু ফিভার ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোম নিয়ে আসছে। এগুলোতে অবস্থাটা বেশি খারাপ হয়ে যায়। ৪ জন শিশু মারা গেছে। শেষ পর্যায়ে তারা আসছে এবং তাদের কো-মরবিট কনডিশন নিয়ে আসছে। মেনিনজাইটিস, লিউকোমিয়া আক্রান্তরা মারা যাচ্ছে।” তিনি বলেন, “আউটডোরেও অনেক রোগী আসছে। অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের প্র্যাকটিসেও আমরা পাই। অগাস্ট-সেপ্টেম্বরে বোঝা যাবে, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে কি না?” শিশুদের জন্য করোনাভাইরাসের চেয়ে ডেঙ্গুকে বেশি বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করে অধ্যাপক শফি বলেন, “কোভিডে বাচ্চাদের মাইল্ড সিম্পটম হয় এবং তাদের ঝুঁকিটা কম থাকে। কিন্তু ডেঙ্গুতে শিশুরা অনেক ঝুঁকিতে থাকে।” লকডাউনে অন্যান্য রোগীর সংখ্যা কম হওয়ায় এখনও রোগী ভর্তি নিতে পারলেও আইসিইউ সবসময় পূর্ণ থাকছে বলে জানান তিনি। আক্রান্ত শিশুদের বেশি করে পানি ও পানি জাতীয় খাবার দেওয়ার তাগিদ দিয়ে অধ্যাপক শফি আহমেদ বলেন, “সবাই মনে করে, জ্বর কমলেই ভালো হয়ে গেছে। কিন্তু ডেঙ্গুজ্বর কমার সাথে সাথে জটিলতা বাড়তে থাকে। সেজন্য জ্বর কমার ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত খুবই খেয়াল রাখতে হবে।” ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে ছোট শিশুদের ফুলহাতা জামা-কাপড় পরানো এবং সবসময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক। সেন্ট্রাল হাসপাতালের চিকিৎসক সুজিত কুমার রায় বলছেন, তার হাসপাতলে এখন পর্যন্ত সাধারণ চিকিৎসায়ই শিশুরা সুস্থ হচ্ছে, কারোরই আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়নি। বেশি মাত্রার জ্বর আসলে, মুখে অরুচি থাকলে, কিছুই খেতে না পারলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ডেঙ্গুর পরীা করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। “চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোন ওষুধ খাওয়া যাবে না। অনেক সময় জ্বর প্যারাসিটামলে না কমলে অনেকে কোফেনাক সাপোজিটরি ব্যবহার করেন। এই জাতীয় জ্বর কমানোর ওষুধে ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা শোচনীয় হয়ে যেতে পারে। এগুলো কোনোভাবেই দেওয়া যাবে না। ডেঙ্গু হলে বাসায় থাকা নিরাপদ না, হাসপাতালে ভর্তি হওয়াই উত্তম।” এই চিকিৎসকের পরামর্শ, বাসার আনাচে কানাচে যেখানে মশা থাকতে পারে সেখানে স্প্রে করতে হবে। মশার বংশবিস্তার যাতে না হয় সেজন্য ঘর-বাড়ি পরিষ্কার রাখতে হবে, কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারীর চাপে যেখানে হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি নেওয়ার জায়গা নেই, তার মধ্যে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উপর চাপ পড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, করোনাভাইরাস ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ একসাথে চলায় মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।
“জ্বর আসলেই মানুষ আগে করোনার চিন্তা করছে। যখন দেখছে করোনা হয়নি, তখন আবার ডেঙ্গুর পরীা করছে। ফলে রোগটা নির্ণয় হতে বেশি দেরি হয়ে যায় এবং রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।” আবার একই ব্যক্তির ডেঙ্গু ও করোনাভাইরাস দুটোই হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “কেউ করোনাভাইরাস থেকে ভালো হওয়ার পথে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। কেউ ডেঙ্গুর জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। জ্বর হলে লণের জন্য অপো না করে দ্রুত ডেঙ্গু ও করোনাভাইরাসের পরীা করতে পারলে শুরুতে রোগ নির্ণয় করে ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। “এখন অনেক হাসপাতাল ডেঙ্গু ডেডিকেটেড করা হয়েছে। কারও ডেঙ্গু ও করোনা দুটি হলে সে চিকিৎসা নেবে কোথায়? আবার করোনায় আক্রান্ত কারও ডেঙ্গু হলে সে কোথায় চিকিৎসা নিবে? এসব ঝামেলা দূর করতে সব হাসপাতালেই ডেঙ্গু ও করোনা- দুটোর ব্যবস্থাই থাকতে হবে।” মশা নিধনে স্থানীয় সরকার ও নাগরিকদের যুক্ত করে জোরদার অভিযান চালালে সফলতা আসত বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি সবাইকে বাড়ি পরিষ্কারে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here