সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্তে এক আদর্শ নড়াইল

0
166

নড়াইল জেলা প্রতিনিধি : সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্তে এক আদর্শ জনপদ ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু নির্যাতন ১৯৫০-২০২১ লজ্জিত বাংলাদেশ”সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্তে এক আদর্শ জনপদ হিসেবে সুনাম ছিল সম্পূর্ণভাবেই আলাদা।যতই দিন যাচ্ছে এই সম্প্রীতির সুনাম থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে,আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে, সাম্প্রদায়িক চেতনা যতোই বৃদ্ধি পাচ্ছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ততোই আক্রান্ত হচ্ছে তার প্রতিবেশী,পরিচিত বা রাজনৈতিক ব্যাক্তি বিশেষ কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো পক্ষের হিংস্র আক্রোশ দ্বারা। প্রতিদিন (মিডিয়ায়) তথা গণমাধ্যমে কোনো না কোনো জেলা/উপজেলা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর,বিশেষ করে (সনাতনী) হিন্দুদের উপর হামলার খবর প্রকাশিত হচ্ছে ঘনঘটা করে। এই সঙ্কটের সৃষ্টি হয় ১৯৪৭ সালে ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগের মধ্য দিয়ে,কলকাতায় হিংস্র দাঙ্গা লুটপাট এবং হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। সরকারি হিসাবে এই হত্যার পরিমান ছিল ১০ লাখ। বেসরকারিভাবে পরিমান হয়তো আরো বেশী। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলো বিনয়,বাদল, দিনেশ, ক্ষুদিরাম, সূর্য সেনদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। ব্রিটিশরা দেশত্যাগের আগে, মোহন লাল করমচাঁদ গান্ধী, জওহর লাল নেহেরু আর জিন্নাহ সাহেবকে নিয়ে মাউন্টব্যাটেন সাহেব যে বিষবৃক্ষ রোপন করলেন প্রকটভাবে তার ক্ষত আজও বহন করতে হচ্ছে। পুরানো হিংসা আজও থামেনি। উল্লেখ্য,,১৯৫০ সালে এ হিংস্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নোয়াখালী এবং বরিশালের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লো। কারণ,,তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একটি মহল এই হিংস্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে দিতে খবর রটিয়েছিল মিথ্যা তথ্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে।খবরটি ছিলো,,কোলকাতায় শেরে বাংলা একে ফজলুল হককে হিন্দুরা মেরে ফেলেছে। ফলে তীব্রভাবে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় আক্রান্ত হয় হিন্দুরা।
এটি ছিল পরিকল্পিতভাবে পাকিস্তান সরকারের একটি পরিকল্পনা। সে সময় ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় ৯ দিনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো প্রায় দশ হাজার হিন্দুকে। এই হিংস্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়েছিল ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।তৎকালিন বরিশালের মাধবপাশার জমিদার বাড়ির প্রায় ২০০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়। এই এলাকার তীব্র আক্রান্ত গ্রাম হলো লাকুটিয়া এবং কাশিপুর গ্রাম।
তবে সে সময়ে মুলাদীর নদী লাল হয়ে গিয়েছিল মানুষের রক্তে,মেরে ফেলা হয়েছিল ২৫০০ হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষকে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল বাড়িঘর। লুটপাট করা হয়েছিল সহায়-সম্পদ। ধর্ষণের শিকার হয়েছিল অসংখ্য নারী।
দখল করা হয়েছিল অনেকের জমিজমা। এরা সবাই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। এরপর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও এদেশীয় লুটারদের দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি লুটপাট, দখল করে মুক্তিযুদ্ধের পরেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত ছিল,আজও তা অব্যাহত। মানুষের প্রত্যাশা ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার এসব লুটারদের বিচার করবে, হিন্দু সম্প্রদায়ের দখলকৃত জায়গা উদ্ধার ও দখলকরীদের শাস্তি দেয়া হবে।
কিন্তুু,,দুঃখের বিষয়,সেই বিচার কার্যকারী হয়নি আজও। বরং দিনের পর দিন অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা বেড়েই চলছে। এক্ষেত্রে কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলই পিছিয়ে নেই।
আজ বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে,
অত্যাচার ও নিযাতনের ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে অথচ আজও কোনো নির্যাতনকারী বা দখলদারদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ব্যবস্থায় শাস্তি হয়নি। ঘটনাক্রমে দিনাজপুরের একটি ঘটনা উল্লেখ্য। দিনাজপুরের সাংবাদিক আজাদুল হক জুয়েল তার এলাকার সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষজন নিয়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি সংবাদ সম্মেলন করে দাবি তুলেছিলেন সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের জন্য।
দাবি তুলেছিলেন হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচারের। চিরিরবন্দর ও খানসামার ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘুদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবিও তুলেছিলেন তাহারা।
সাম্প্রদায়িক হিংস্র ছোবলের ঘটনার চিত্র এখন সারাদেশে। তাই সমগ্র বাংলাদেশে শান্তিকামী মানুষকেই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আসলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তথা হিন্দুদের জন্য করণীয় কি?
দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা দিনাজপুর।
এ জেলায় বহু সম্প্রদায়ের বসবাস। সমতলের আদিবাসী থেকে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সাঁওতাল, ওঁরাও, হরিজন,ঋষি, ডোমসহ সব ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মিলন মেলা এই দিনাজপুর।
কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিকস্থ বিভিন্ন কারণে প্রায় দেড় দশক ধরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো দিনাজপুর জেলায়ও দলিত ও সংখ্যালঘুদের উপর নির্বিচারে হামলার অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে এখন এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। বলতে গেলে….
প্রতিদিন কোননা কোনো জেলা/ উপজেলা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংখ্যালঘু নির্যাতন,বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট,জোর পূর্বক জমি দখল,ধর্মান্তরিতকরন,খুন,গুম,ধর্ষন,দেশ ত্যাগে বাধ্য করা, এই ঘটনাগুলো নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে এখন বাংলাদেশে।
২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুরে বিরল উপজেলার মঙ্গলপুর ইউনিয়নে দলিত ও সংখ্যালঘুদের উপর ব্যাপক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। অথচ আজ অবধি তার কোনো বিচার হয়নি। ওই সময় ওই ইউনিয়নের রঘুনাথপুর, শিকারপুর, সরাহার, বড়োয়া বন্ধুগাঁওসহ বিভিন্ন গ্রামে বসবাসরত সংখ্যালঘুদের উপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়ে তখন ওইসব গ্রামের অনেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেন নাই।
২০০৩ সালে ১৮ই নভেম্বর চট্রগ্রামের বাঁশখালী ট্রাজেডি আরো বিবৎস রুপ নেয়।
শীলপাড়ার তেজেন্দ্রলাল শীলের বাড়িতে,একই পরিবারের নারী পুরুষ শিশুসহ ১১জনকে ঘুমন্ত অবস্থায় নৃশংসভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।
এই নৃশংসতার মাষ্টার মাইন্ড ছিলো,বিএনপির দলীয় সাংসদ জাফর উল্বা চৌধুরীর চাচাত্বো ভাই,তৎকালিন কালীপুর ইউপি চেয়ারম্যান এবং বিএনপির সভাপতি। দুঃখের বিষয় ১৭বছর গত হলো,আজো বিচারের বানী নিভৃতে রয়েছে।
তারপর ২০১২ সালের ৪ আগস্ট চিরিরবন্দরের বলাই বাজারে এবং এর আশেপাশের গ্রামগুলোতে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা আবারো দিাজপুরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার গৌরব গাঁথা কলঙ্কিত হয়।
সেই হামলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকের ঘর-বাড়িতে আগুন, লুটপাট, মারধর করা হয়। জনগণের প্রত্যাশা ছিল প্রশাসনের যথাযথ উদ্যোগ এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের কার্যকর প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেই কলঙ্কের দাগ মুছে যাবে। কিন্তু সেই সব ক্ষততো মুছেই নাই বরং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে শান্ত ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার দিনাজপুরকে আরো অশান্ত করে তোলা হয়।
আরো আলোচিত ঘটনা ছিলো,
২০১২ সালে ২৯শে সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধবিহারে ন্যাক্কার বর্বোরতর সাম্প্রদায়িক হামলা কারো অজানা নয়! সেই ঘটনাটিও ছিলো সম্পুর্ন সাজানো হিংস সাম্প্রদায়িক হিংস্রতার অন্তরায়। ,
২০১৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে খানসামার ভাবকী ইউনিয়নাধীন রামনগর, ফোকাসাপাড়া, মণ্ডলপাড়া, কাচিয়ানী বাজার, কালির বাজার এবং চিরিরবন্দর উপজেলার ভুষিরবন্দর ও রানীরবন্দরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, ধানের পুঁজে এবং ধান ও আঁখ ক্ষেতে হামলা চালানো হয়।
হামলাকারী দুর্বৃত্তরা তাণ্ডব চালিয়ে সেই রাতে গ্রামটির ফোকাসাপাড়া নিবাসী গৌরহরি শাহর ১০০ বিঘা জমির ১৬টি ধানের পুঁজসহ বাইরের খোলানে থাকা ৫টি ঘর, নিখিল চন্দ্র রায়ের ২টি শোয়ার ঘরসহ ঘরের সমস্ত মালামাল, নিরঞ্জন রায়ের দুইটি ঘরের সমস্ত মালামাল, রামনগর-মণ্ডলপাড়া নিবাসী ফনীন্দ্রনাথ রায়ের বাড়ি ও ধানের পুঁজে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
সেই রাতেই ভুষিরবন্দরে ব্যবসায়ী ও দিনাজপুর জেলা মটর পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি ভবানী শংকর আগরওয়ালার বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটতরাজ চালানো হয়। তার ৭টি ট্রকে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। ২টি গোডাউন ভর্তি সারসহ কোটি টাকার মালামাল লুট করা হয়।
চিরিরবন্দরের ১১নং তেঁতুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সুনীল কুমার সাহার ২০ বিঘা জমির ধান আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। হামলাকারীরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনকে বেদম মারধরও করে।
তাহারা ৪নং খামারপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ বালাপাড়া বটেরহাটে অবস্থিত গৌরহরি শাহর হাসকিং মিলের মিটার, মর্টার ও বারান্দার চালা ভেঙে ফেলে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here