বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বাদী মহিতুলের মৃত্যুবার্ষকীর কথা কেউ মনে রাখেনি

0
395

স্টাফ রিপোর্টার : জাতি বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার বিচার পেয়েছে। কিন্তু ‘৭৫ পরবর্তী দীর্ঘ সময় জাতিকে এর জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে গোটা দেশ যখন ঘুুমে আচ্ছন্ন তখন একদল বিপথগামী সেনা অফিসার ও সৈনিকরা ধানমন্ডীর ৩২ নম্বর রোডের জাতির পিতার বাড়িতে আকষ্মিক আক্রমন করে। তারা একে একে পরিবারের সবাইকে হত্যা করে। শুধু ৩২ নম্বরের ওই বাড়িতেই নয়, সেদিন ঘাতকরা রাজধানী ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর আত্নীয় স্বজনদের বাসাবাড়িতেও আক্রমন করে তাদের অনেককে হত্যা করে। রাষ্ট্রপতির সামরিক সচির কর্ল জামিল এ খবর পেয়ে তার সরকারী বাসভবন থেকে নিজেই জীপ গাড়ি চালিয়ে ৩২ নম্বরে যাওয়ার জন্য রওনা হন। কিন্তু মানিক মিয়া এভিনিউ বিশৃঙ্খল সৈনিকরা কর্ল জামিলের গাড়ি আটকে দেয়। সেখানেই সৈনিকরা গুলি করে তাকে হত্যা করে। ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সেনা সদস্যরা বিনা বাধায় আত্নসমর্ণ করে। তবে ইপিআর ও পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ প্রতিরোধ গড়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। সে সময় ৩২ নম্বরের নীচের একটি কক্ষে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী বা পিএ এএফএম মহিতুল ইসলাম । তিনি তার সাধ্যমতো খুনিদের আটকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। বিপথগামী সৈনিকদের হাতে তিনি আহত হন। আল্লার অশেষ কৃপায় িসেদিন দেশের বাইরে থাকায় জীবনে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা আর শেখ রেহেনা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তার রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ এর নেতাকর্মীরা হতাশা গ্রস্থ হয়ে পড়েন। অনেকেই নিজের জীবন বাঁচাতে আত্নগোপনে যান। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া বিশেষ নিরাপত্তা বাগিনী রক্ষীবাহিনীর হাজার হাজার সৈনিক এক প্রকার নিরবে আত্নসমর্পন করে ঘাতক মোস্তাক সরকারের আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীসহ বঙ্গবন্ধুর আদর্শর কোন কোন সৈনিক বিচ্ছিন্ন ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। সেনা বাহিনী ও পুলিশের সোচ্চার ভুমিকার কারনে সেদিন দলের নেতাকর্মীরা প্রিয় নেতা রাষ্টপতি বঙ্গবন্ধুর জানাযায় অংশ নিতে পারে নি। তাকে কবরস্থ করতে পারেনি। ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে তাকে রাজধানী ঢাকার কোন কবরস্থানে দাফন না করে বঙ্গবন্ধুর জন্মভিটা টুঙ্গিপাড়ায় অনেকটা নিরবে কবরস্থ করেন সেনা সদস্যরা। খুনিরা সেদিন ভেবেছিল বঙ্গবন্দু হত্যার সব আলামত বা স্বাক্ষীকে তাার চিরতরে বিনাশ করতে পেরেছে। কিন্তু একটি প্রবাদ আছে সব ঘটনার একটি শেষ স্বাক্ষী থাকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন পিএ মহিতুল ইসলাম। ১৯৭৬ সালের অক্টোবরে তিনি যান লালবাগ থানায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রতিকার চেয়ে মামলা করতে। কিন্তু তখনও মোস্তাকের সরকার ক্ষমতায় থাকায় মহিতুলকে থানা পুলিশ লাঞ্চিত করে থানা থেকে বের করে দেন। এ খবর শুনে সেনা সদস্যরা মহিতুল কে খুজতে থাকে। জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবেতিনি ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যশোরের মণিরামপুরে পালিয়ে যান। সেই থেকে তার অপেক্ষা ছিলো কবে দেশে পরিবর্তন ঘটবে আর তিনি বাদী হয়ে জাতিরজনককে স্বপরিবারে হত্যাকান্ডের বিচার দাবি করে থানায় মামলঅ করবেন। তার সাথে গোটা জাতি এই হত্যার বিচারের আশায় বুক বেধেছিল। অবশেষে ১৯৯৬ সালে ‘৭৫ পরবর্তী আওয়ামীলীগ শেখঝ হাসিনার নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে মহিতুল ইসলাম তার ইচ্ছার কথা লেঅক মারফত শেখ হাসিনাকে অবহিত করেন। প্রধানমন্ত্রীর সাই পেয়ে তিনি ধানমন্ডী থানায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। জাতিকে কলঙ্ক মুক্ত করার প্রথম পদক্ষেপ ছিল এটি। এদিকে খন্দকার মোস্তাক সরকারের সব কাজের বৈধতা দিয়ে জারি করা ইনডেমিনিটি বিল সংসদে কন্ঠভোটে বাতিল করে সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার পথ সুগম করে। সেই পথ ধরেই জাতি দীর্ দিন পরে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া স্বচক্ষে অবলোকন করে। এক পর্যায়ে খুনিদের বিচার জাতি দেখতে পেরেছে। খুনিদের অনেকের ফাঁসি কার্কর হয়েছে। অনেকেই কারাগারে আটক অবস্থায় মারা গেছে। কয়েকজন খুনি দেশান্তরিত হয়ে নির্বাসনে আছে।
কিন্তু এতো কিছু হয়েছে যার মামলায় সেই মহিতুল ইসলামকে জাতি বা আওয়ামীলীগ মনে রাখেনি। বঙ্গবন্ধুর বিচার হয়েছে তাঁর জন্য। অথচ তাঁকে দল মনে রাখেনি। যশোরের কৃতি সন্তান এএফএম মহিতুল ইসলামের ২৫ আগস্ট মৃত্যু বার্ষিকীর দিনটি নীরবে পার হয়ে গেছে। তার কবরে এক টুকরো ফুল দেয়নি কেউ। তাকে স্মরণ করে কোন মসজিদে হয়নি দোয়া। যে আগস্টে জাতি জাঁকজমক ভাবে স্মরণ করছে ১৫ আগস্টে নিহত বা শহীদদের। সেই আগস্টের ২৫ তারিখ ছিল বঙ্গবন্ধুর পিএ ও তার হত্যা মামলার বাদী ও একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী এএফএম মহিতুল ইসলামের ৫ম মৃত্যু বার্ষকী। ২০১৬ সালের ২৫ আগস্ট তিনি মারা যান। বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার সাক্ষী হয়েছিলেন এবং এ ব্যাপারে থানায় পুলিশ কেস করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড মামলার বাদীও ছিলেন।
তিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। ছিলেন মুজিব বাহিনীর সদস্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে অস্ত্র সমর্পণ করেছিলেন এবং বাংলাদেশ সরকার অফিস শাখার সহকারী হিসাবে যোগদান করেন। মুখ্যসচিবের কার্যালয় থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে ফাইল বহন করার সময় রাষ্ট্রপতি তাকে পছন্দ করেছিলেন। তাকে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সহকারী হিসাবে বদলি করা হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে একদল সেনা কর্মকর্তা হত্যা করেছিলো। মহিতুল তখন তাঁর বাসভবনে রাষ্ট্রপতির সহকারী ছিলেন। ১৯৭৬ সালের অক্টোবরে তিনি লালবাগ থানায় মামলা দায়েরের চেষ্টা করেন। খুনিরা তখনও ক্ষমতায় থাকায় দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে লাঞ্ছিত করেছিলেন। শেখ মুজিবের দল আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় থাকাকালীন ২ অক্টোবর তিনি মামলা করতে সক্ষম হন। এই মামলায় রায়টি ২০০৯ সালের নভেম্বরে প্রকাশ হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ইনডেমনিটি আইনটি বাতিল করে দেয়। কারণ এ আইনটি ঘাতকদের বিচারের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। দণ্ডিত দোষীদের মধ্যে পাঁচজনকে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিল।
১৯৭৫ সালে হত্যার চেষ্টায় মুহিতুল ইসলাম আহত হয়েছিল, তিনি হাসপাতাল থেকে তার গ্রামের বাড়ি যশোরের মণিরামপুরে পালিয়ে আসেন। তবে সেনাবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায়। তাকে সেনা হেফাজতে নির্যাতন করা হয়েছিল। শেখ মুজিবের এপিএস শাহরিয়ার জেডআর ইকবাল মহিতুল ইসলামকে সেনা হেফাজত থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করেছিলেন। মহিতুল সরকারী চাকরি অব্যাহত রেখেছিলেন, ত্রাণ অধিদপ্তরের পরিচালক হয়েছিলেন। ২০০২ সালে তাকে তার অফিস থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
মুহিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৫ আগস্ট ২০১৬ সালে মারা যান। যশোরের মণিরামপুরের কাশিমপুরে তাকে সমাহিত করা হয়। কিন্তু এই বীরের প্রতি কারোর কোন দায়বদ্ধতা না থাকায় এলঅকাবাসী হতবাক হয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here