অদ্বিতীয় উচ্চতায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য রুকুনউদ্দৌলাহ

0
151

দেশের যে কোন প্রান্তের মানুষের কাছে যদি প্রশ্ন করা হয় অদ্বিতীয় উচ্চতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যটি কোথায় অবস্থিত। সম্ভবত এ প্রশ্নের জবাব কেউ দিতে পারবে না। যেখানে অবস্থিত তার আশেপাশের মানুষও বলতে পারবে বলে মনে হয় না। অনন্য উচ্চতায় স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটি ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারে অবস্থিত। যার উচ্চতা ১২৩ ফুট। সারা দেশে বঙ্গবন্ধুর এমন উচ্চতার ভাস্কর্য আর নেই। আওলিয়ায়ে আযম গাজি পীরের স্মৃতিধন্য এই বারোবাজার। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের জন্য আবারো ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিতে যাচ্ছে জনপদটি। যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের পাশে অবস্থিত এই বারোবাজার থেকে পশ্চিম দিকে যে সড়কটি যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর গেছে সেই সড়ক ধরে সাড়ে তিন কিলোমিটার গেলে বাম হাতে শমশের নগর। বুড়ি ভৈরব নদীর তীরের এ গ্রামটি এখন আদি নামে পরিচিত নয়। গ্রামটি বারোবাজার ও কাষ্টভাঙা ইউনিয়নের ঘোপপাড়া ও সাদিপুর গ্রামের অংশ বিশেষ নিয়ে ১৯৯৮ সালে শমশেরনগর নামকরণ করা হয়। এ নামকরণের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শমশেরনগর গ্রামের হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার রাশেদ শমশের বলেন, আমার বাবা বীরমুক্তিযোদ্ধা শমশের আলী বিশ্বাসও হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার ছিলেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। এই গ্রামে ওই সময় ১৪ জন রাজাকার ছিল। বাবা একা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৩৫ সালে তাঁর জন্ম এবং তিনি ১৯৯০ সালের ২০ জুন সড়ক দুর্ঘটনাায় মারা যান। তিনি বলেন, ২০০১ সালে নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতার শিকার হয়ে আমরা বাড়ি-ঘর ফেলে পালিয়ে যাই। তারা আমাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল লুট করে। মাছের ঘেরে বিষ ঢেলে দেয়। ফসল ও গাছপালা কেটে সাবাড় করে। ডা. শমশের আলীর ছেলে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেমোরিয়াল কলেজ’র প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম বলেন, বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীরা আমার বাবা বীরমুক্তিযোদ্ধা ডা. শমশের আলী স্মৃতি বিজড়িত শমশের নগর বাজার ও আমার ভাই ডা. রাশেদ শমশের কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেমোরিয়াল কলেজ’ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। প্রায় দু’বছর আমাদেরকে ভিটে ছাড়া জীবনযাপন করতে হয়। আমাদের একমাত্র অপরাধ ছিল বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং আমরা স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগ করতাম। তারা জাতির পিতাকে অস্বীকার করে তাঁর নামের কলেজটিকে শয়তানের আখড়া বলে আখ্যায়িত করে। তারা কলেজের সাইন বোর্ড ও বঙ্গবন্ধুর ছবি ভেঙেচুরে তাতে মানুষের মল লাগিয়ে অপবিত্র করে। এক পর্যায়ে শ্মশানে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোটের এই জঘন্যতম প্রতিহিংসামূলক আচরণ আমি মেনে নিতে পারিনি। আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। প্রতিজ্ঞা করি যদি কোন দিন সুযোগ পাই তাহলে আমার এলাকায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এমন একটা কিছু করবো যা গোটা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করবে। করবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন ও ইতিহাস সৃষ্টি। তিনি বলেন, আমরা আট ভাই ও দু’বোন এক জায়গায় বসে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হওয়ায় ও বঙ্গবন্ধুর দলকে সমর্থন করায় আমাদের ওপর নির্বিচারে যে অত্যাচার নিপীড়ন চালানো হয়েছে সেই মুক্তিযুদ্ধ, জাতির জনক এবং মুক্তিযোদ্ধা বাবার স্মৃতি জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করে হলেও এলাকায় শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা বসে থাকিনি। আমরা প্রথমেই গ্রামটির নামকরণ করেছি মুক্তিযোদ্ধা বাবার নামে শমশের নগর। বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেছি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং প্রতিবন্ধী স্কুল। আমরা নির্মাণ করেছি একটি মসজিদ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠা করেছি ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেমোরিয়াল মহাবিদ্যায়। গত ১৬ আগস্ট এই কলেজটি সরকারি করণ করা হয়েছে। কলেজটির শিক্ষার্থী সংখ্যা এখন পাঁচ শতাধিক। এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আমরাই দিয়েছি ২৪ বিঘা জমি। যার মধ্যে মহাবিদ্যালয়ের জন্য দেয়া হয়েছে ১৫ বিঘা। এই লেখার শুরুতে বলা হয়েছিল সর্বোচ্চ উচ্চতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যটি কোথায় অবস্থিত। সে কথার উত্তর দিতে গিয়ে এত সব কথা বলতে হয়েছে। সেই ভাস্কর্যটি শমশের নগরে অবস্থিত। এটি স্থাপনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম বলেন, জাতির জনকের প্রতি অবমাননার প্রতিশোধ নিতে আমাদের এলাকায় তাঁকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তা আমাকে সারাক্ষণ তাড়া করতো। ভাবতে থাকি আমেরিকার ‘দ্য স্ট্যাচু অব লিবারটি’ এর অনুকরণে কিছু একটা করা যায় কিনা। এমনই ভাবনার মাঝেই আমার পরিকল্পনা চুড়ান্ত করি। আমার স্বপ্নের স্থাপনার নাম নির্ধারণ করি ‘স্ট্যাচু অব স্পিস অ্যান্ড ফ্রিডম’। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সরকারি মহাবিদ্যালয় চত্বরে স্থাপিত এই স্থাপনার উচ্চতা ১২৩ ফুট। এই স্থাপনার ওপর সাড়ে ১৩ ফুট দৈর্ঘের বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটি দন্ডায়মান অবস্থায় স্থাপন করা হয়েছে। মুজিববর্ষের প্রতীক হিসেবে ১০০ ফুট এবং দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধনিতার প্রতীক হিসেবে ২৩ ফুট নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল অবকাঠামোতে প্রথম থেকে ষষ্ঠতলার ও গঠন একই রকম এবং উচ্চতা ১১ফুট বাই ৬ ফুট ৬৬ ফুট। এটি স্বাধীনতা আন্দোলনের নিউকিয়াস খ্যাত ১৯৬৬ সালের ৬ দফার প্রতীক। প্রথম তলায় হবে ক্যাফেটোরিয়া, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় বঙ্গবন্ধু যাদুঘর, চতুর্থ তলায় বঙ্গবন্ধু গবেষণাগার ও গ্রন্থাগার, পঞ্চম তলায় ছাত্র সংসদ ও দ্য ইয়াং বেঙ্গল স্পোর্টিং কাব এবং ষষ্ঠ তলায় প্রজন্ম ৭১ ও মুক্তিযোদ্ধা অফিস।
অবকাঠামোটির দেয়াল হবে স্বচ্ছ কাঁচের তৈরি, যার চারদিকে ২৩ টি গ্লাস বক্স থাকবে। রাতে গ্লাস বক্স থেকে চারদিকে আলো ছড়িয়ে পড়বে। এটি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৩ বছরের সফল আন্দোলন ও পরাধীনতার অন্ধকার থেকে স্বাধীনতার আলোয় আলোকিত হওয়ার প্রতীক। মূল অবকাঠামোটি একটি প্রজ্জ্বলিত মোমবাতির আকৃতি ধারণ করবে। এটি ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনের সাক্ষি হয়ে থাকবে। স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক ‘দ্য স্ট্যাচু অব স্পিস অ্যান্ড ফ্রিডম’ এর প্রধান প্রবেশদ্বার থেকে দু’পাশে থাকবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পূর্ণ ভাস্কর্য, মাঝের সারির প্রথমে থাকবে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের আবক্ষ ভাস্কর্য, ৪টি পানির ফোয়ারা, দৃষ্টিনন্দন ফুলগাছ, শেখ রাসেলের পূর্ণ ভাস্কর্য, মহান স্বাধীনতার অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রারা গান্ধীর ভাস্কর্য। মূল বেদির দু’পাশে ১৯৪৭-১৯৭১ দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানি অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সংগ্রাম, আন্দোলন ও সফলতার প্রতীক ২৩ ধাপের সিঁড়ি বেয়ে উঠে স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হবে। এ ভাস্কর্যের দু’পাশে থাকবে জাতীয় চার নেতার আবক্ষ ভাস্কর্য। পাশে থাকবে বাংলার সর্বশেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদৌলার আবক্ষ ভাস্কর্য। বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্যের শ্রদ্ধাবেদির সামনে থাকবে ছয়টি ধাপের সিঁড়ি। এই সিঁড়িগুলো হলো,Ñ ১৯৫২ সালের সফল ভাষা আন্দোলন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের আন্দোলন ও নির্বাচন। ১৯৬৬ সালের ৬দফা আন্দোলন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা অর্জনের প্রতীক। শ্রদ্ধা বেদির পেছনে ঘৃণা প্রদর্শনের জন্য থাকবে বাংলার দুই বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোস্তাক আহমেদ ও মীর জাফর আলী খাঁর আবক্ষ ভাস্কর্য। বঙ্গবন্ধু যাদুঘরে থাকবে ১৫ আগস্টের সব শহীদ, সাত বীরশ্রেষ্ঠ, ভাষা শহীদ, স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গণি ওসমানী ও ১১ জন সেক্টর কমান্ডারের আবক্ষ ভাস্কর্য। বঙ্গবন্ধু গবেষণাগার ও গ্রন্থাগারে থাকবে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের দুর্লভ ছবি ও বঙ্গবন্ধুর জীবন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের তথ্য সম্বলিত দুর্লভ বই ও দলিলপত্র। অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম বলেন, দ্য স্ট্যাচু অব স্পিস অ্যান্ড ফ্রিডম এর কাজ শেষ হলে এটিই হবে মুজিববর্ষের সেরা উপহার। আগামী ১৭ মার্চের মধ্যে এর সব কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি। এ ধরণের স্থাপনা বাংলাদেশে ও বিশ্বের কোথাও নেই বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক সফল রাষ্ট্রনায়ক ও বিশ্বের কোন জাতির পিতার ভাস্কর্য ১২৩ ফুট উঁচুতে স্থাপন এটিই প্রথম। এই স্থাপনা যদি আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সব শক্তির রাজনৈতিক তীর্থভূমি হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাংলার ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক রূপে গড়ে ওঠে তাহলে শ্রম সার্থক হবে। (লেখক প্রবীণ সাংবাদিক, ‘সংবাদ’-র বিশেষ প্রতিনিধি)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here