হিসাব সহকারী সালামের ১৫ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে দায় স্বীকার শিক্ষা বোর্ডে চেক জালিয়াতি করে আড়াই কোটি টাকা আত্নসাতের ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে দুদক

0
243

স্টাফ রিপোর্টার : যশোর শিক্ষা বোর্ডে চেক জালিয়াতির ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে দুদক। দুদক যশোর আঞ্চলিক অফিসের উপ পরিচালক নাজমুছছাদাতের নেতৃত্বে একটি টিম গতকাল দিন ভর বোর্ডে অবস্থান নিয়ে চেক সংশ্লিষ্টদের দফায় দফায় জিঙ্গাসাবাদ করেছেন। জব্দ করেছেন চেক জালিয়াতি সংক্রান্ত সব নথি। এদিকে দুদকের তদন্ত টিম বোর্ড ত্রাগ করার পর পরই চেক জালিয়াতির হোতা হিসাব সহকারী পলাতক আব্দুস সালামের স্ত্রী চেয়ারম্যানের দপ্তরে তার সাথে সাক্ষাত করে একটি দরখাস্ত ও ১৫ লাখ টাকার একটি ডিডি দাখিল করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে চেয়ারম্যান প্রফেসর ডঃ আমির হোসেন মোল্যা বলেন, আব্দুস সালাম চেক জালিয়াতির দায় স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করে দরখাস্ত দাখিল করেছে। একই সাথে ১৫ লাখ টাকার একটি ডিডি জমা দিয়ে সে জানিয়েছে পর্যায়ক্রমে সমুদয় টাকা ফেরত প্রদান করবে। বিষয়টি তাৎক্ষনিক দুদক উপ পরিচালকসহ বোর্ডের সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছি। এদিকে বোর্ডের চেয়ারম্যান কর্তৃক গঠিত অভ্যান্তরিন তদন্ত কমিটিও গতকাল থেকে তদন্ত কাজ শুরু করেছে। তদন্ত টিমের প্রধান কলেজ ইন্সপেক্টর এএসএম গোলাম রব্বানী জানান, তদন্তের প্রথম দিন চেক সংশ্লিষ্টদেও জিঙ্গাসাবাদ করেছি। নথিপত্র পর্যালোচনা করেছ্ িহিসাব বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কর্মচারীদেও সাথে কথা বলেছি। ব্যাংকের ম্যানেজারের সাথে কথা বলে বিষয়টি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। তদন্ত অব্যাহত আছে।
সরকারের ভ্যাট আয়কর পরিশোধের জন্য শিক্ষা বোর্ডের হিসাব বিভাগ থেকে ইস্যুকৃত ৯টি চেকের সাথে ব্যাংকের একাউন্টের স্টেটমেন্টের মিল না থাকায় গত বৃহস্পতিবার বোর্ডের অভ্যন্তরীন অডিট কমিটি এই চেক জালিয়াতির ঘটনাটি উদঘাটন করেন। বোর্ডের হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগের উপ পরিচালক ইমদাদুল হক ও অডিট অফিসার আব্দুস সালাম আজাদ বিষয়টি নিয়ে বোর্ডের সচিব প্রফেসর আলী আর রেজার সাথে কথা বলেন। তারা যৌথ ভাবে সোনালী ব্যাংক শিক্ষা বোর্ড শাখার ম্যানেজারের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। এক পর্যায়ে সচিবের কক্ষে হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম ও চেক রেজিস্ট্রার ও প্রিন্টের দায়িত্বে থাকা মোমিন উদ্দিনকে ডেকে নেন। তারা সেখানে আব্দুস সালাম ও মোমিন উদ্দিনকে দফায় দফায় জিঙ্গাসাবাদ করেন এবং চেক জাতিয়াতির মাধ্যমে আড়াই কোটি টাকা আত্নসাতের বিষয়টি নিশ্চিত হন। এক পর্যায়ে সকল কাগজপত্রসহ বোর্ড সচিবসহ অডিট ও হিসাব নিরীক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ চেয়ারম্যান দপ্তরে যান ও তাকে অবহিত করেন। ততক্ষনে হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম বোর্ড থেকে পালিয়ে যায়। চেয়ারম্যানের দপ্তরে বোর্ডের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চেক জালিয়াতির বিষয়ে পর্যালোচনা করে দেখতে পান ৯টি চেকের মাধ্যমে মাত্র ১০ হাজার ৩৬ টাকা যেখানে ভ্যাট আয়কর বাবদ সরকারের সংশ্লিষ্ট হিসাবে জমা হওয়ার কথা সেখানে বোর্ডের সোনালী ব্যাংক থেকে ভেনার্স প্রিন্ট্রিং এন্ড প্যাকেজিং এর ব্যাংক হিসাবে ও শাহী লাল স্টোরের ব্যাংক হিসাবে সর্ব মোট ২ কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ১০ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ঘটনাটি মুহুর্তে যশোরশহরসহ সারা দেশে চাউর হয়ে যায়। মিডিয়া কর্মীরা ছুটে যান শিক্ষা বোর্ডে চেয়ারম্যানের দপ্তরে। চেয়ারম্যান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে দ্রুত পদক্ষেপ হিসেবে কলেজ ইন্সপেক্টরকে প্রধান করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। পর দিন এ ঘটনায় কোতয়ালী থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করতে যান বোর্ডের সচিব। কিন্তু আইনী জটিলতার কারনে থানার অফিসার ইনচার্জ অভিযোগটি দুদকে পাঠানোর পরামর্শ দেন। গতকাল রোববার সকালে বোর্ড সচিব দুদক কার্যালয়ে যাওয়ার আগেই পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে দুদকের উপ পরিচালক নাজমুছছাদাতের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের টিম বোর্ডে যান এবং চেয়ারম্যান ও সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেন। এক পর্যায়ে দুদকের উপ পরিচালক ভেনার্স প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং এর স্বত্বাধিকারী বাবু ইসলাম ও শাহী লাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী আশরাফুল আলমকে ডেকে তাদের বক্তব্য শোনেন। একই সাথে বোর্ডের হিসাব গ্রহন ও বর্হিগমন বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে দুদকের টিম পৃথক পৃথক ভাবে কথা বলেন। এ বিষয়ে বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর ডঃ আমির হোসেন মোল্যা জানান, দুদকের টিম সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছেন। যাদের ব্যাংক একাউন্টে চেক গুলো জমা হয়েছে তাদের সাথেও কথা বলেছেন। তবে তা সবই পৃথক ভাবে গোপনে। ফলে কে কি বলেছে তা আমার জানা নেই। এই বিষয়ে দুদক পরিচালক বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা কেবল কাজ শুরু করেছি। তথ্য উদঘাটন করতে সময় লাগবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের সাথে বার বার কথা বলবো। চেক ও বিলপত্র এবং টেন্ডার সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু ফাইল জব্দ করেছি। এগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তারপরই বলা যাবে কে কিভাবে এই জালিয়াতি করেছে। কে কে এর সঙ্গে জড়িত, টাকা গুলো কে কিভাবে ভাগ পেয়েছে ইত্যাদি বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারবো। তবে আপনারা নিশ্চিত থাকুন অপরাধী রেহায় পাবে না।
এদিকে ঘটনার পর থেকে পলাতক থাকলেও দুদকের তদন্ত টিম বোর্ড থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে হিসাব সহকারী আব্দুস সালামের স্বাক্ষর করা একটি দরখাস্ত ও তার স্বাক্ষরিত ১৫ লাখ ৪২ হাজার টাকার একটি ডিডি নিয়ে হাজির হন আব্দুস সালামের স্ত্রী। তিনি বলেন, তার স্বামী বাড়িতে নেই। তবে লোক মারফত তার কাছে এই টাইপ করা দরখাস্ত ও স্বাক্ষরিত সোনালী ব্যাংক যশোর শিক্ষা বোর্ড শাখার ২০০০০০০০০০০০১ নম্বর হিসাবের ঢ়ড়প ৫০০৯৯৬০ নম্বর চেকের মাধ্যমে বোর্ডের সচিবের নামে একটি একাউন্ট পে ডিডি পাঠিয়ে দিয়েছে। তিনি এগুলো চেয়ারম্যান স্যারের কাছে দিতে বলেছেন। তাই আমি এগুলো নিয়ে চেয়ারম্যান স্যারের কাছে দেব। বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষনিক বোর্ডে উপস্থিত কর্মকর্তাদের মধ্যে সাড়া জাগলেও মুহুর্তে তা মিলিয়ে যায় কর্মচারী সমিতির নেতাদের মন্তব্যে। তারা বলেন , এসবই সাজানো। বোর্ডের একজন কর্মকর্তা নিজেকে রক্ষা করতে এই জালজালিয়াতি ও টাকা ফেরতের নাটক করছেন। এদিকে এই বিষয়ে চেযারম্যানের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলসি। যারা আমাকে ফঁসানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল এখন তাদের মুখ শুকিয়ে গেছে। তিনি বলেন, চেক জালিয়াতির বিষয়টি এখন পরিস্কার। হিসাব সহকারী নিজেই চেক জালিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করেছে। সে দায় স্বীকার করে লিখিত দিয়েছে। সে দাবি করেছেন এই চেক জালিয়াতির সাথে বোর্ডের অন্য কেউ জড়িত নয়। সে নিজেই ব্যক্তিগত ভাবে এর জন্য দায়ী। এছাড়া ভেনার্স প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং এবং শাহী লাল স্টোরের কেউ চেক জালিয়াতির সাথে জড়িত নয়। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে সে উক্ত টাকা গ্রহণ করেছে এবং তার নিজ প্রয়োজনে খরচ করে ফেলেছে। জালিয়াতিকৃত টাকা সে ফেরত দিতে ইচ্ছুক। আজ ১৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা সচিব শিক্ষা বোর্ড এর একাউন্টে ফেরত দিয়েছে। বাকি টাকাও সে পর্যায়ক্রমে ফেরত দিতে অঙ্গীকার করেছে। এই জন্য সে সময় প্রার্থনা করেছে।
এদিকে কম্পিউটার টাইপ করা এই দরখাস্তের বিষয়ে বোর্ডে নানা রকম কথা চাউর হচ্ছে। অনেকেই বলছেন হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম যেহেতু পলাতক তাহলে এই কম্বিপউটার কম্পোজ তাকে কে করে দিল। কিভাবে তিনি চেকে স্বাক্ষর করলেন। তিনি কিভাবে দরখাস্ত করতে পারলেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষন করলে বোর্ডের সচিব আলী আর রেজা বলেন, বিষয়টি কিভাবে করা হয়েছে তা পলাতক আব্দুস সালাম ভালো বলতে পারবেন। তবে টাকা ফেরত আসতে শুরু করেছে। সালাম স্বীকার করে নিয়েছে এটাই বড় কথা।
এদিকে দায় স্বীকার করে টাকা ফেরত দিলেই কি আব্দুস সালাম রেহায় পাবেন ? এমন প্রশ্নের উত্তরে বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, বোর্ডের নিজস্ব আইন দ্বারা ও দেশের প্রচলিত আইনে আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here