শিক্ষা বোর্ডের চেক জালিয়াতির হোতা আব্দুস সালাম সাময়িক বরখাস্ত আবারও ১৫ লাখ ৯৮ হাাজর টাকার আরো একটি চেক জালিয়াতির সন্ধান লাভ

0
14

স্টাফ রিপোর্টার : চেক জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্নসাতের দায়ে স্বঘোষিত অপরাধী যশোর শিক্ষা বোর্ডের হিসাব সহকারী পলাতক আব্দুস সালামকে চাকুরী চ্যুত করা হয়েছে। গত সোমবার গভীর রাতে বোর্ডের সচিব স্বাক্ষরিত এক পত্রে তাকে সাময়িক চাকুরী চ্যুতির এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এদিকে গতকালও বোর্ডের হিসাব শাখা থেকে ১৫ লাখ ৯৮ হাজার টাকার একটি চেক উদ্ধার করা হয়, যে চেকের মুড়ি অংশে আয়কর বাবদ ১৭০০ টাকা সরকারের রাজস্ব খাতে জমা হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু ওই চেকের ডান পাশের অংশে জনৈক প্রাপকের নামে ১৫ লাখ ৯৮ হাজার ১০ টাকা পেমেন্ট করা হয়েছে। বিষয়টি অধিকতর অনুসন্ধানের জন্য দুদকে পাঠানো হয়েছে বলে বোর্ড সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এদিকে গতকালও দুদক টিম দফায় দফায় শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন সেকশনে বিশেষ করে বোর্ডের আয় ও ব্যয় হিসাব গ্রহণ বিভাগের বিভিন্ন নথিপত্র অনুসন্ধান করেন এবং সন্দেহজনক কয়েকটি ফাইল জব্দ করে নিয়ে যান বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।
শিক্ষা বোর্ডের হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগের উপ পরিচালক ইমদাদুল হকের নেতৃত্বে অডিট অফিসার অধ্যাপক আব্দুস সালাম আজাদসহ একটি টিম সম্প্রতি বোর্ডের ব্যয় এবং সোনালী ব্যাংকের পেমেন্ট সিলিপ মেলাতে গিয়ে দেখতে পান যে বোর্ড কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন কাজের বিল ও ভ্যাট আয়কর পরিশোধ বাবদ যে পরিমান টাকার অংকের চেক ইস্যু করেছে সোনালী ব্যাংক শিক্ষা বোর্ড শাখা তার থেকে বহু গুন বেশি পেমেন্ট দিয়েছে। বিষয়টিতে গরমিল দেখা দেওয়ায় হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগের উপ-পরিচালক মহোদয় অডিট অফিসারকে পেমেন্ট চেকের মুড়ি ও প্রাপকের অংশ মিলিয়ে দেখার নির্দেশনা দেন। ওই নির্দেশ মোতাবেক চেক মিলাতে গিয়েই ধরা পড়ে আড়াই কোটি টাকার চেক জালিয়াতির ঘটনা। বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছেন তারা বিভিন্ন সময়ে বিল পরিশোধ বাবদ সরকারের ভ্যাট ও আয়কর বাবাদ ৯টি চেকে সরকারের রাজস্ব বাবদ ১০ হাজার ৩৬ টাকা পরিশোধের জন্য চেক ইস্যু করেন। কিন্তু ব্যাংকের পেমেন্ট স্লিপে দেখা যায় ওই ৯টি চেকের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট পার্টিকে ২ কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ১০ টাকা পরিশোধ করেছে সোনালী ব্যাংক শিক্ষা বোর্ড শাখা। ঘটনাটি অনুসন্ধানে দেখা যায় এই চেক জালিয়াতির হোতা হচ্ছেন হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম। যিনি ২০০৩ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় সাতক্ষীরা সরকারী কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী শেখ আব্দুল্লাহ -আল-মামুন, যার রোল নং- ৬১৫৯৭৭ এর উত্তরপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে লাখ টাকা উপার্জন করে। বিষয়টি ধরা পড়ার পর ২০০৪ সালের ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বোর্ড কমিটির সভায় পরীক্ষা শাখায় মাস্টারোলে কর্মরত আব্দুস সালামকে চাকুরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু যেহেতু তিনি বোর্ডের একজন পোষ্য এই কারনে মানবিক দিক বিবেচনা করে তাকে অন্যত্র চাকুরি খুজে নেওয়ার জন্য কমিটি ৬ মাসে সময় দেন। ওই কমিটির সভায় উপস্থিত সদস্যরা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, মাস্টারোলে কর্মরত আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে বার বার এহেন অভিযোগ ওঠায় তাকে আর বোর্ডের কোন কাজে রাখা সমিচিন হবে না। তারপরও রহস্যজনক কারনে আব্দুস সালামকে বোর্ড থেকে সরানো হয়নি। ফলে অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে মহাদুর্নীতিবাজ আব্দুস সালাম বোর্ডে কর্মরত থেকেই বিভ্নি অবৈধ পন্থায় কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। যার সর্বশেষ ঘটনা সম্প্রতি উদঘাটিত চেক জালিয়াতির মাধ্যমে আড়াই কোটি টাকা আত্নসাৎ।
এদিকে গতকাল সাময়িক চাকুরিচ্যুত বোর্ডের হিসাব সহকারী আব্দুস সালামের উপশহর ই-১৪১ নম্বর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় মহাসমারোহে তার বিশাল অট্রালিকার নির্মান কাজ অব্যাহত। রাজমিস্ত্রিীরা নিশ্চিন্তে কাজ করছেন। এসময় আব্দুস সালামের খোঁজ করতেই তার একজন স্বজন বাড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে জানান, সালাম এই মুহুর্তে বাড়িতে নেই। ঘন্টা দুই আগে বাইরে গেছে। এদিকে অনুসন্ধানে দেখা যায় আব্দুস সালাম যে বিশাল অট্রালিকা হাকিয়েছেন তার অংশ বিশেষ সরকারী জায়গার ওপর। এছাড়া সরকারী রাস্তার জমি দখল করে সে বর্তমানে একটি টিনশেড, গরুর গোলায় ও অন্যান্য স্থাপনা তৈরী করে বসবাস করছে। প্রশ্ন করতেই আব্দুস সালামের ওই স্বজন জানান, এই বাড়ির পূর্ব পাশের্^র রাস্তা ৬০ ফুট ও দক্ষিন পাশের রাস্তা ৩০ ফুট চওড়া। কিন্তু সবাই বাড়ি করার সময় রাস্তার ওপর পিলার দিয়েছে বলে সালামও ওই পথ অনুসরণ করেছে। এছাড়া সরকারী পিচের রাস্তাতো আর ওতো চওড়া হবে না। তাই রাস্তার জায়গা দখল করে সালাম বসতবাড়ি নির্মান করেছে। হাইজিং যদি মনে করে তাহলে এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করে দিতে পারে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে আব্দুস সালামের ওই স্বজন বলেন সেটা হাউজিং এর বিষয়।
এদিকে চেক জালিয়াতির ঘটনা তদন্তে বোর্ডের কলেজ ইন্সপেক্টর কে এম গোলাম রব্বানীর নেতেৃত্বে গঠিত ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটিও গতকাল দিনভর বোর্ডের বিভিন্ন সেকশনের কর্মকর্তা কর্মচারীদের পৃথক পৃথক ভাবে সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান বলেন, কাজ এগিয়ে চলছে। অগ্রগতি এখনো আশাব্যঞ্জক। ঠিক পথেই তদন্ত এগিয়ে যাচ্ছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে গোলাম রব্বানী বলেন, আমরা তদন্ত কমিটির সব সদস্য গত সোমবার যে দুটি ব্যাংকের হিসাবে ৯টি চেক ক্যাশ হয়েছে সে গুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছি। ইউভি ম্যাশিনে চেক গুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কমিটির সদস্যরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, চেকের কাগজ অরিজিনাল। তবে যে ৯টি চেকের মাধ্যমে আড়াই কোটি টাকা লুট করা হয়েছে সেই ৯টি চেকের প্রাপকসহ টাকার অংক লেখার কাজে যে কম্পিউটার ও প্রিন্টার ব্যবহার করা হয়েছে তা বোর্ডের সফটওয়্যারযুক্ত নয়, অন্য কোন উপায়ে ওই চেক গুলো প্রিন্ট করা হয়েছে। কারন বৈধ চেকের লেখার সাথে ওই ৯টি চেকের লেখার অমিল পাওয়া গেছে। ধারনা করা হচ্ছে ওই চেক গুলো বিশেষ কোন পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্য কোন প্রিন্টার থেকে অথবা অন্য কোন উপায়ে বোর্ডের হিসাব শাখার কম্পিউটার থেকে প্রিন্ট করা হয়েছে। তবে বিষয়টি সম্পর্কে আরো পরিস্কার হওয়ার জন্য অধিকতর তদন্ত হওয়া দরকার বলে তদন্ত কমিটির সদস্যরা মনে করছেন বলে জানান কমিটির প্রধান কলেজ ইন্সপেক্টর কে এম গোলাম রব্বানী।
এদিকে এই চেক জালিয়াতি ছাড়াও অন্য বিভিন্ন প্রকারের দুর্নীতির মাধ্যমে যশোর শিক্ষা বোর্ডের যে সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন, যাদের জ্ঞাত আয়ের সাথে তাদের অর্জিত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির কোন মিল নেই দুদক ইতিমধ্যে তাদের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে শুরু করেছে। দুদক সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে বোর্ডের কমপক্ষে ১৫ জন কর্মকর্তা কর্মচারীর আয় ব্যয়ের হিসাব ইতিমধ্যে দুদকের হাতে। দুদক এসব ফাইল নিয়ে কাজ শুরু করেছে। অচিরেই এসব কর্মকর্তা কর্মচারীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বর্হিভুত সম্পদ অর্জনের দায়ে মামলা দায়ের করবে দুদক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here