অর্থনৈতিক কেলেংকারীতে জেরবার যশোর শিক্ষা বোর্ড – আবারো চেক জালিয়াতির মাধ্যমে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ !

0
203

বিশেষ প্রতিনিধি : অর্থনৈতিক কেলেংকারীতে জেরবার যশোর শিক্ষা বোর্ড । দফায় দফায় চেক জাতিয়াতির ঘটনায় বোর্ডের প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতাকেই দায়ী করছেন সকলেই। এদিকে গত ২১ অক্টোবর আরো ১৬টি চেকের মাধ্যমে ২ কোটি ৪৩ লাখ টাকার জালিয়াতি ধরা পড়েছে। ১১ অক্টোবর আরো একটি চেক জালিয়াতির মাধ্যমে ১৫ লাখ ৯৮ হাজার টাকা আতœসাৎ করার খবর প্রকাশ পায়। এরও আগে গত ৭ অক্টোবর ৯টি চেকের মাধ্যমে ২ কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ১০টাকা আতœসাতের প্রমান পায় বোর্ডের হিসাব ও নিরীক্ষা শাখার উপপরিচালক এমদাদুল হক এবং অডিট অফিসার আব্দুস সালাম আজাদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডের অভ্যান্তরীণ অডিট কমিটির সদস্যরা। বিষয় গুলো তাৎক্ষনিক বোর্ডের নির্বাহী প্রধান ও হিসাব সংরক্ষণকারী সচিব এবং চেয়ারম্যান মহোদয়কে লিখিত ভাবে অবহিত করেন অডিট কমিটি। প্রথম চেক জালিয়াতির ঘটনায় ইতিমধ্যে দুদক প্রাথমিক তদন্ত শেষে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিবসহ ৫ জনকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা করেছে। এদিকে এসব ঘটনায় বোর্ড চেয়ারম্যান কর্তৃক কলেজ পরিদর্শক গোলাম রব্বানীকে প্রধান করে গঠিত ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের তদন্ত রিপোর্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দাখিল করতে ব্যর্থ হয়ে ফের সময়ের আবেদন করেছে।
যশোর শিক্ষা বোর্ডে দুর্নীতি অনিয়ম আর টেন্ডার কেলেংকারীর ঘটনা নতুন নয়। এসব কর্মকান্ডে বোর্ডের কোটি কোটি টাকা পকেটস্থ করার অভিযোগ রয়েছে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। যার প্রমান স্বরূপ এর আগে বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকের নামেই দুদকে মামলা চলমান । তবে চেক জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৬ কোটি টাকা আতœসাতের ঘটনা এবারই উদঘাটন করেছে বোর্ডের হিসাব ও নিরীক্ষা শাখার উপ পরিচালক এমদাদুল হক ও অডিট অফিসার আব্দুস সালাম আজাদের সমন্বয়ে গঠিত অডিট কমিটি। এই কমিটি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব অনুযায়ী ২০১৬-১৭, ১৭-১৮,১৮-১৯,২০-২০ ও ২০-২১ অর্থ বছরের আয় – ব্যয় বোর্ডের সকল ব্যাংক একাউন্টের স্টেটমেন্টের সাথে মিল করণ করার সময় দেখতে পান যে, বোর্ডের ব্যয় একাউন্ট এসটিডি ২৩২৩২৪০০০০০২৪ হিসাব খাতে বোর্ড কর্তৃক ইস্যুকৃত চেকের বিপরীতে বিপুল পরিমান অর্থ বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলে বেরিয়ে পড়ে থলের বিড়াল। প্রথম দফায় ৯টি চেকের মাধ্যমে আড়াই কোটি টাকা আতœসাতের প্রমান পায় অডিট কমিটি। তাদেও অনুসন্ধানে ধরা পড়ে বোর্ডের হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম এসব চেক জালিয়াতির সাথে জড়িত। অনুসন্ধান চলাকালেই গত ১০ অক্টোবর হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম লিখিত ভাবে এই চেক জালিয়াতির দায় স্বীকার করে বোর্ড কর্তৃপক্ষকে ডিডি মারফত ১৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা ফেরত প্রদান করে। ওই লিখিত স্বীকারোক্তিতে সালাম সময় প্রার্থনা করে বাকি টাকাও পর্যায়ক্রমে বোর্ডের একাউন্টে ফেরত প্রদান করার অঙ্গীকার করে । এর পর পরই দুদক চেক জালিয়াতির সাথে জড়িত থাকার দায়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান ডঃ প্রফেসর আমির হোসেন মোল্যা ও সচিব প্রফেসর আলী আর রেজাসহ ৫জনকে অভিযুক্ত করে দুদক আইনে মামলা করে। এই অবস্থায় বোর্ডের অডিট কমিটি ব্যাংক স্টেটমেন্টের সাথে ব্যয় হিসাবের মুড়ি ও খরচের অংক মেলাতে যাচাই বাছাই অব্যাহত রাখে। এরই মধ্যে গত ১১ অক্টোবর আরো একটি চেক জালিয়াতির সন্ধান মেলে। যেখানে সরকারের ভ্যাট আয়কর প্রদানের জন্য বোর্ড কর্তৃপক্ষ একটি চেক ইস্যু করে। যার মুড়ি চেক নং – ০৫১৮২৮৫ , টাকার পরিমান ১৭৭৬ টাকার স্থলে মেসার্স ভেনাস প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং এর নামে ১৫ লাখ ৯৮ হাজার ১০ টাকা আতœসাৎ করার খবর প্রকাশ পায়পরিশোধ করা হয়েছে। চলমান অডিটে গত ২১ অক্টোবর আরো ১৬টি চেক জালিয়াতির মাধ্যমে ২ কোটি ৪৩ লাখ ৭ হাজার ৮৭৮ টাকা আতœসাতের প্রমান পায় কমিটি। যেখানে আয়কর ও বোর্ডের বিভিন্ন কাজের বিল পরিশোধের জন্য বোর্ড কর্তৃপক্ষ বিগত ৫টি অর্থবছরে ১৬টি চেকের মাধ্যমে পার্টিকে ১৪ লাখ ৭২ হাজার ২০ টাকা পরিশোধের নির্দেশনা প্রদান করে। কিন্তু ওই ১৬টি চেকের বিপরীতে সোনালী ব্যাংক যশোর শিক্ষা বোর্ড শাখা থেকে ২ কোটি ৪৩ লাখ ৭ হাজার ৮৭৮ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, ২০-০৮-২০১৭ ইং তারিখে বিজনেস আইটির কাজের আয়কর বিল বাবদ ১২ হাজার২৭৫ টাকা পরিশোধের জন্য বোর্ড কর্তৃপক্ষ ২৯৪৫১৮ নং চেক ইস্যু করা হয়। কিন্তু ওই চেকের মিাধ্যমে ২১.৮.২০১৭ তারিখে পার্টিকে ৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৩৪ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। যশোর শহরের জামে মসজিদ লেনের নুর এন্ট্রারপ্রাইজের কাজের বিল বাবদ ২৯৪৭৭৪ নং চেকের মাধ্যমে ৫৮ হাজার ৩৫ টাকার স্থলে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৬৫ টাকা, মেসার্স খাজা প্রিন্টিং প্রেসের কাজের বিল বাবদ ৫০৯৫৫৭ নং চেকের মাধ্যমে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৫৬০ টাকার স্থলে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৩০ টাকা, নিহার প্রিন্টিং প্রেসের কাজের বিল বাবদ ৫০৯৫৭৮ নং চেকের মাধ্যমে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৫৩০ টাকার স্থলে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩০ টাকা, সামিয়া ইলেকট্রনিক্সেও কাজের বিল বাবদ ৫১০০৮৫ নং চেকের মাধ্যমে ৫৫ হাজার ৭৬২ টাকার স্থলে ৬০ লাখ ৮৯ হাজার ৯০ টাকা, জামে মসজিদ লেনের নুর এন্ট্রারপ্রাইজের কাজের বিল বাবদ ৫১০০৮৪ নং চেকের মাধ্যমে ৮১ হাজার ৪৭৬ টাকার স্থলে ১৫ লাখ ৮৯ হাজার টাকা, বোর্ডের সেকশন অফিসার আবুল কালাম আজাদকে সম্মানী বাবদ ৫১০৯২৫ নং চেকের মাধ্যমে ৯৪ হাজার ৩১৬ টাকার স্থলে ৩০ লাখ ৯৮ হাজার টাকা, মসজিদ লেনের নুর এন্ট্রারপ্রাইজের কাজের বিল বাবদ ৫১৩৪০১ নং চেকের মাধ্যমে ৭৮ হাজার ৭০৭ টাকার স্থলে ৩৫ লাখ ৯৮ হাজার টাকা, মিম প্রিন্টিং প্রেসের কাজের বিল বাবদ ৫১৫৩০৪ নং চেকের মাধ্যমে ২০ হাজার ২৪০ টাকার স্থলে ২৫ লাখ ৮৫ হাজার ১০ টাকা, বোর্ডের সাধারণ সহকারী (হিসাব সহকারী) আব্দুস সালামকে টিএ বিল বাবাদ ৬ হাজার ১৯৫ টাকার স্থলে ২৫ লাখ ৮০ হাজার ১০ টাকা, হাইকোট মোড়ের শাহী সুপার মার্কেটের শাহী লাল স্টোরের কাজের বিল বাবদ ৫১৫৮১৫ নং চেকের মাধ্যমে ১১ হাজার ১৯৯ টাকার স্থলে ৩৫ লাখ ৮০ হাজার ১০ টাকা,মসজিদ লেনের নুর এন্ট্রারপ্রাইজের কাজের বিল বাবদ ৫১৬৭৯৬ নং চেকের মাধ্যমে ৯২ হাজার ৩৪৬ টাকার স্থলে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৩০ টাকা ও ৫১৬৮৩২ নং চেকের মাধ্যমে ১৬ হাজার ৮৩৩ টাকার স্থলে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৪০৩ টাকা, শরীফ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং এর কাজের বিল বাবদ ৫১৬৮৩৫ নং চেকের মাধ্যমে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫০ টাকার স্থলে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৪৫০ টাকা, অর্গানেটের কাজের বিল বাবদ ৫১৮১০৭ নং চেকের মাধ্যমে ২১ হাজার ১৭৭ টাকার স্থলে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৪০৭ টাকা এবং অর্গানটের কাজের ভ্যাট বাবাদ সরকারের ভ্যাট খাতে পরিশোধ করার জন্য ৫১৮৯৩৮ নং চেকের মাধ্যমে ২৭ হাজার ৭৫৮ টাকার স্থলে ৩ লাখ ৩১ হাজার ২৩৯ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯৪৫১৮ ও ২৯৪৭৭৪ নং চেক দুটি ইস্যু করা হয় ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে। যখন বোর্ডেও সচিবের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান চেয়ারম্যান প্রফেসর আমির হোসেন মোল্যা এবং চেয়ারম্যান ছিলেন প্রফেসর আব্দুল আলিম। ৫০৯৫৭৭ ও ৫০৯৫৭৮ চেক দুটি ইস্যু করা হয় ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের ২৯-০৪-১৯ ইং তারিখে যে সময় বোর্ডের সচিব ছিলেন প্রফেসর তবিবর রহমান ও চেয়ারম্যান ছিলেন প্রফেসর আব্দুল আলিম। ৫১০৪৮৫, ৫১০০৮৪, ৫১০৯২৫, ৫১৩৪০১ ও ৫১৫৩০৪ চেক গুলো ইস্যু করা হয় ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থ বছরে। সে সময় যশোর শিক্ষা বোর্ডের সচিবের দায়িত্বে ছিলেন প্রফেসর আলী আর রেজা ও চেয়ারম্যান ছিলেন প্রফেসর আব্দুল আলীম। ৫১৫৮০১,৫১৫৮১৫,৫১৬৭৯৬, ৫১৬৮৩২,৫১৬৮৩৫, ৫১৮১০৭ ও ৫১৮৯৩৮ নং চেক গুলো ইস্য করা হয় ২০১৯-২০, ২০-২১ ২১-২২ অর্থ বছরে। যখন বোর্ডের সচিবের দায়িত্বে আছেন প্রফেসর আলী আর রেজা ও চেয়ারম্যান প্রফেসর ডঃ আমির হোসেন মোল্যা। এর আগে শনাক্ত ১০টি চেকের ইস্যুকারীও বর্তমান সচিব আলী আর রেজা ও চেয়ারম্যান আমির হোসেন মোল্যা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম ইতিপূর্বে বোর্ডের অডিট সেকশনের নি¤œমান সহকারী ছিলেন। তাকে ওই সেকশনের জুনিয়র অডিটর হিসেবে পদায়ন করার পর থেকে সে এই চেক জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আতœসাতের কর্মকান্ড শুরু করে বলে অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অর্শিবাদপুষ্ট হওয়ার কারনে বিভিন্ন সেকশনে বিশেষ করে হিসাব প্রদান, হিসাব গ্রহণ, অডিট অর্থাৎ যে সব সেকশনে সরাসরি অর্থ লেনদেনের কর্মকান্ড হয়, চেক আদান প্রদানের কর্মকান্ড হয় সে সব সেকশনেই আব্দুস সালামকে পোষ্টিং দেওয়ার বিষয়টিও রহস্যজনক বলে মন্তব্য বোর্ডের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের। কারণ আব্দুস সালাম একজন স্বীকৃত দুর্নীতিবাজ। মাস্টারোলের কর্মচারী থাকা অবস্থায় ২০০২ সালের এসএসসি পরীক্ষার খাতা জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকা উপার্জন করার অপরাধে ২০০৩ সালে বোর্ড কমিটির সভায় তাকে চাকুরিচ্যুতি করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে তাকে তো চাকুরি চ্যুত করায় হয়নি উপরন্ত ২০১৫ সালে এই মহাদুর্নীতিবাজ আব্দুস সালামের চাকুরী স্থায়ীকরণ করা হয়।
এদিকে গত কয়েক বছর ধরে এই চেক জালিয়াতির ঘটনা ঘটলেও কেন এতো দিন বিষয়টি উদঘাটন হয়নি সে বিষয়েও অনেকেই প্রশ্ন করেছেন। ঘটনাটি অনুসন্ধান করার জন্য বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা দুদক কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
এদিকে এই অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান মোল্যা আমির হোসেন ও সচিব আলী আর রেজার সাথে মোবাইল ফোনে দফায় দফায় যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাদেরকে পাওয়া যায়নি। বোর্ডের এই শীর্ষ দুই কর্মকর্তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া গেছে। ফলে এ বিষয়ে তাদে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here