হিসাব প্রদান ও অডিট সেকশনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে যশোর বোর্ডে চেক জালিয়াতি কান্ডের পর থেকে বিরাজ করছে চরম স্থবিরতা

0
158

স্টাফ রিপোর্টার : যশোর শিক্ষা বোর্ডে চলমান অর্থকেলেংকারীর ঘটনায় বিরাজ করছে চরম স্থবিরতা । কর্মকর্তা কর্মচারীদেও মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। স্পষ্টত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে কর্মকর্তা আর কর্মচারীরা। একটি পক্ষ চেক জালিয়াতির হোতাদের রক্ষা করতে মরিয়া। আর অপর পক্ষটি এই চেক জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলের শাস্তির দাবি জানাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বোর্ডের এক্সিকিউটিভ পার্সন সচিবের অনুপস্থিতি বোর্ডের স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তা চেয়ারম্যানও ঘটনার পর থেকে মন্ত্রনালয়ে বিভিন্ন সরকারী বা বোর্ড সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় বোর্ডের কাজ কর্মে আগের মতো মনোযোগ দিতে পারছেন না বলেই অভিযোগ কর্মকর্তা আর কর্মচারীদের। এমন পরিস্থিতিতে চলতি মাসের বেতন ভাতার বিল সঠিক সময়ে পাবেন কিনা তা নিয়ে কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে সংশয়ের। এদিকে বোর্ডের চেক জালিয়াতির পর সাময়িক চাকুরিচ্যুত হিসাব সহকারী আব্দুস সালামের সেকশন হিসাব প্রদান শাখা কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিয়েছেন তদন্তের স্বার্থে। চলমান অভ্যন্তরীণ তদন্তের মধ্যেই গতকাল বোর্ড চেয়ারম্যানের বিশেষ নির্দেশনা মোতাবেক বোর্ডের ডিডি প্রফেসর এমদাদুল হক অডিট সেকশনও লক করে দিয়েছেন। ওই সেকশনের গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের তথ্য পাচারের আশংকায় এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে বলে মনে করছেন বোর্ডের অনেক দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। এই গ্রুপ মনে করছে হিসাব সহকারী আব্দুস সালামের সাথে বিশেষ সখ্যতার সম্পর্ক রয়েছে জুনিয়র অডিটর রফিকের । ফলে রফিক অডিট সেকশনে কর্মরত থাকলে আব্দুস সালামের চেক জালিয়াতির সঠিক তথ্য উদঘাটনে সে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। তাই ওই সেকশন আপাতত বন্ধ করে রফিককে অন্যত্র বদলী করা হতে পারে। আবার এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। অনেকেই বলছেন চেক জালিয়াতি চক্রের মুখোশ উন্মোচনের পর বোর্ডের ভাবমুর্তি দারুন ভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে। বোর্ডের অভ্যন্তরীন তথ্য মিডিয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢালাওভাবে ফাঁস করাসহ এসবের পেছনে অডিট সেকশনের জুনিয়র অডিটর হিসেবে কর্মরত রফিকসহ অন্যদের হাত থাকতে পারে সন্দেহে তাকে ওই সেকশনের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রাথমিক এই ব্যবস্থা।
তিন দফায় বোর্ডের হিসাব সহকারী আব্দুস সালামসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ২৬টি চেকের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা আত্নসাৎ করে। গত ৭ অক্টোবর বোর্ডের আয় ব্যয়ের সাথে ব্যাংকের স্টেটমেন্ট মিলকরনের সময় বিভিন্ন তারিখে স্বাক্ষরিত ৯টি চেকের লেনদেনে গরমলি দেখতে পায় অডিট অফিসার প্রফেসর আব্দুস সালাম আজাদ। বিষয়টি তিনি বোর্ডের ডিডি, সচিব ও চেয়ারম্যানের দৃষ্টিতে আনেন।এ বিষয়ে বোর্ডের সোনালী ব্যাংক শাখা থেকে পাপ্ত স্টেটমেন্টের কপিসহ চেকের মুড়ি প্রাথমিক ভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টরা বুঝতে পারেন একটি বড় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। পর্যায়ক্রমে ২০১৬-১৭ অর্থ বছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থ বছর পর্যন্ত বিগত সকল বছরের আয় ব্যয়ের সাথে ব্যাংকের স্টেটমেন্ট মিলকরনের সময় ধরা পড়ে আরো ১৬টি চেক। এরও কয়েকদিন আগে ধরা পড়ে আরো ১টি চেক । সব মিলিয়ে ২৬টি চেকের মাধ্যমে সালামচক্র বোর্ডের হিসাব বর্হিভুত প্রায় ৫ কোটি টাকার ওপর লোপাট করেছে। চেয়ারম্যান প্রফেসর ডঃ আমির হোসেন মোল্যা জোর দিয়ে বলছেন, এসব চেক লেখার দায়িত্ব সচিবসহ তার অধিনস্থ হিসাব গ্রহণ ও প্রদান শাখার কর্মকর্তা কর্মচারীদের। তিনি প্রতিটি ফাইলে অনুমোদন প্রদানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য গ্রাহককে চেক প্রদানের অনুমোদন প্রদান করেন মাত্র। বিভিন্ন টেবিল ঘুরে ফাইলটি প্রিন্ট করা চেকে সচিবের স্বাক্ষর হওয়ার পরই তার টেবিলে আসে চেকে স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য। তিনি প্রতিটি চেকের মুড়ির সাথে মুল অংশের মিল পর্যবেক্ষন করেই তাতে স্বাক্ষর করেন। হয়তো কখনো কখনো চেয়ারম্যানের কাজের ব্যস্ততার কারনে প্রতিটি চেকের পাতা পুঙ্খানুপুঙ্খন পর্যবেক্ষন বা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে স্বাক্ষর করা হয় না। যেহেতু চেকের বাম পাশের মুড়ির অংশে চেক প্রিন্টকারীর স্বাক্ষর থাকে। চেকের মুল অংশের বাম পাশে সচিবের স্বাক্ষর থাকে । তাছাড়া বোর্ডের সফটওয়্যারে চেকের মুড়ি ও মুল অংশে একই অংকের টাকাসহ যাবতীয় লেখা প্রিন্ট হতে বাধ্য । এখানে ভিন্নতার কোন সুযোগ নেই। ফলে এসব বিষয় গুলো মাথায় রেখেই কোন কোন সময় ব্যস্ততার কারনে সরল বিশ^াসে স্বাক্ষর করা হতে পারে। তাছাড়া আমার টেবিলে চেক সহি হওয়ার আগেই সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা তো বার বার পরীক্ষা নিরীক্ষা করেই চেকে স্বাক্ষর করেন। তাই আমি নিশ্চিন্তে চেকে স্বাক্ষর করি। শুধু আমি নয়, অতীতের চেয়ারম্যানগণও এই নিয়মেই চেকে স্বাক্ষর করেছেন। কিন্তু আমাদের কারোর মাথায় কখনো আসেনি যে যারাই চেক প্রিন্টসহ এই কাজের দায়িত্বে আছেন তাদেরই কেউ কেউ চেকটির মুল অংশে বাউন্স করে মোটা অংকের টাকা লিখে তা লোপাট করতে পারে। এই প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান অনেকটা জোর দিয়েই বলেন, আমার বিশ^াস সচিব ও চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর সম্পন্ন হওয়ার পর ওই চেক গুলো ডেসপাসের দায়িত্ব থাকে হিসাব প্রদান শাখার হিসাব সহকারী । যখন যিনি ওই চেয়ারে থাকেন তখন তিনিই একাজটি করেন। যেহেতু সম্প্রতি সময়ে আব্দুস সালাম ওই দায়িত্বে ছিলেন ফলে সে চেক গুলোর মুল অংশ ডেসপ্যাচে দেওয়ার পূর্বে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ( কোন ধরনের ক্যামিকাল ব্যবহার করে) পূর্বের লেখা মুছে তদস্থলে নতুন করে প্রাপকের নাম ও টাকার পরিমান কথায় ও অংকে লিখে তারপর ডিসপাস করেছে। তবে এই নিখুঁত কাজটি কেবলমাত্র সালামের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এর পছেনে দক্ষ কুটবুদ্ধি সম্পন্ন অন্য কোনো হাতের ছোঁয়া আছে বলে আমি বিশ^াস করি। ঘটনাটি বিশদ ভাবে অনুসন্ধানে বের হবে বলেই তিনি বিশ^াস করেন। পলাতক চাকুরীচ্যুত আব্দুস সালামকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে কঠোর ইনভেস্টিগেশন করলেই সব জানা যাবে। তারপরও চেকের স্বাক্ষরকারী হিসেবে তিনি বা সচিব কেউ এর দায় থেকে রেহায় পাবেন না যতক্ষণ বিষয়টি উদঘাটিত না হচ্ছে। এদিকে এসব জালিয়াতির চেক যে সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে এবং ব্যাংক কিয়ারেন্সের মাধ্যমে সব টাকা উত্তোলন করে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে ফলে তারাও এই জালিয়াতি চক্রের হোতা বলেই আমরা মনে করছি। আর এই জালজালিয়াতি চক্রের হোতাদের খুজে বের করতেই ইতিমধ্যে হিসাব প্রদান শাখা ও গতকাল অডিট সেকশনটি সাময়িক বন্ধ করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে কেবল মাত্র ডিডির উপস্থিতিতে অডিটর নিজে ওই দুটি কক্ষের তালা খুলে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন। কোন সেকশনের লোককে আপতত ওই দুটি সেকশনে বসার প্রয়োজন নেই। যতক্ষন পর্যন্ত বোর্ডের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিল না করছেন ততক্ষন এই ব্যবস্থা বহাল থাকবে বলে চেয়ারম্যান মোল্য আমির হোসেন জানান।
এদিকে চেয়ারম্যানের এই সিদ্ধান্তকে গভীর চক্রান্তের অংশ হিসেবে মনে করছেন তার প্রতিপক্ষ গ্রুপের কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তারা বলছেন যে রাকিব এই চেক জালিয়াতি উদঘাটনের মুল প্রশংসার দাবিদার তাকে তার সেকশন থেকে বের করে দিয়ে চেয়ারম্যান কি বোঝাতে চাচ্ছেন তা বোধগম্য নয়। এদিকে গত ২ দিনে বোর্ডের চেয়ারম্যানের লোক হিসেবে খ্যাত কয়েকজন চেক জালিয়াতি চক্রের প্রকৃত হোতাদের শাস্তির দাবিতে একটি গণস্বাক্ষর সংগ্রহে নামেন। সেখানেই আপত্তির ও ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন চেয়ারম্যানের প্রতিপক্ষরা।
এদিকে গত ৭ অক্টোবরের পর থেকে যশোর শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন সেকশনের মধ্যে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যার কারনে বোর্ডের স্বাভাবিক কাজকর্মে চরম স্থবিরতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে বোর্ডের অনুমোদন শাখা, নাম ও বয়স সংশোধনী শাখা, হিসাব প্রদান ও গ্রহণ শাখা, কমন সার্ভিস বিভাগ, প্রমানপত্র বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগে ও সেকশনে কাজের কোন সমন্বয় হচ্ছে না। বিশেষ করে বোর্ডের সচিব ও চেয়ারম্যান তাদের চেয়ারে অনিয়মিত হয়ে যাওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকতৃা কর্মচারীরা। এদিকে চেক জালিয়াতির ঘটনা একর পর এক উদঘাটিত হওয়ার কারনেও সবাই আছেন আতঙ্কে। কখন কার নামের চেক কেউ জালিয়াতির করে লাখ লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন কিনা ? সেই চিন্তায় সবাই আলোচনায় ব্যস্ত। বর্তমানে কাজের তুলনায় গছিব বেশি হচ্ছে- এমন মন্তব্য বোর্ডে সেবা নিতে আসা ব্যক্তি বা ছাত্র ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের। তবে এতো কিছুর পরও আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি পরীক্ষা গ্রহনের সাথে সম্পৃক্তরা সকলেই দায়িত্বের সাথে কঠোর ভাবে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন বলে মন্তব্য পরীক্ষা সেকশনের কর্মকর্তা কর্মচারীদের।
এদিকে বোর্ডের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রধান কলেজ পরিদর্শক কে এম গোলাম রব্বানীর নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গতকালও দফায় দফায় বিভিন্ন সেকশনের কাজের সাথে অর্থের লেনদেনসংক্রান্ত বিভিন্ন কাগজপত্র পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। আগামী সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত কমিটি তাদের কাজ শেষ করে একটি সুন্দর রিপোর্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে পারবেন বলে কমিটির প্রধান কলেজ পরিদর্শক গোলাম রব্বানী আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এদিকে ডিডি প্রফেসর এমদাদুল হক ও অডিটর প্রফেসর আব্দুস সালাম আজাদকে চেয়ারম্যানের গৃহিত পদক্ষেপের বিষয়ে জিঙ্গাসা করলে তারা উভয়ই বলেন চলমান প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যান মহোদয় যেটা ভালো মনে করেছেন সেটাই করেছেন। ফলে এ বিষয়ে আমাদের কোন মন্তব্য নেই। তবে প্রয়োজন হলে ডিডি স্যারের উপস্থিতি ওই অডিট সেকশন খোলা যেতে পারে বলে চেয়ারম্যান স্যারের মৌখিক অর্ডার আছে বলে জানান অডিটর প্রফেসর আজাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here