সবুজ প্রযুক্তির সহজ হস্তান্তর চায় কাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশ

0
124

জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনকে (কপ ২৬) সামনে রেখে শূন্য-কার্বন ভিত্তিক টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম জাতীয় জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা প্রণয়ণ করেছে । তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উন্নত ও দূষণকারী দেশগুলো থেকে উন্নয়নশীল দেশে কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহায়তা বিশেষ করে সহজভাবে সবুজ প্রযুক্তির হস্তান্তর চায় সংসদ সদস্যদের নেটওর্য়াক কাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশ। রবিবার (৩১ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনের পালামেন্ট মের্ম্বাস কাবের হলরুমে কাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশের সচিবালয় আর্থ সোসাইটির আয়োজনে এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘রোড টু গ্লাসগো- ইয়ুথ রিফেকশন অন কাইমেট চেইঞ্জ এন্ড কপ২৬’ বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কাইমেট পার্লামেন্টের চেয়ারপার্সন তানভীর শাকিল জয় এমপি। আর্থ সোসাইটির মাইশা নওশীনের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এবং কাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশের ভাইস-চেয়ার ওয়াসেকা আয়েশা খান, কাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশের সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি এমপি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জির সহকারি অধ্যাপক ড. এস. এম. নাসিফ শামস, ইউরোপিয়ান কাইমেট ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি লিড মনোয়ার মোস্তফা এবং প্রতীকি যুব সংসদের নির্বাহী প্রধান ও ইয়ুথনেট ফর কাইমেট জাস্টিসের সমন্বয়ক সোহানুর রহমান প্রমুখ। এসময় জলবায়ু তহবিলের যর্থাথতা নিশ্চিত সংসদ সদস্য ও যুব প্রতিনিধিদের এক যৌথ সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। স্বাগত বক্তব্যে কাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশের আহবায়ক নাহিম রাজ্জাক এমপি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতায় বাংলাদেশের অবদান অনুল্লেখযোগ্য, সামান্য মাত্র হলেও তির দিকে আমরা শীর্ষে । তারপরও আমরা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা সমাধানের একটি টেকসই পথ অনুসন্ধানে গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। টেকসই অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমাদের দেশ-জাতিকে আরো সমৃদ্ধ করার সর্বোত্তম উপায় হলো শূন্য কার্বন প্রবৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা। আমরা এখন জলবায়ু ঝুঁকি থেকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা- এটি এমন এক রূপকল্প, যার অধীনে জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর গৃহীত কর্মযজ্ঞকে অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করে স্থায়িত্বশীলতা, কার্বন শূন্য অর্থনীতির সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নাগরিকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।পরিকল্পনা অনুসারে আমরা চলতি দশকের শেষের দিকে মোট জ্বালানি-বিদ্যুতের ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে নিশ্চিত করব। বিজ্ঞান যা বলছে তার ভিত্তিতে যদি বিশ্বনেতারা আমাদের জলবায়ু তিগ্রস্ত দেশগুলোর কথা শোনেন, আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং স্থির সংকল্পে কাজ করেন তাহলে এই পৃথিবীকে রা করা সম্ভব। কপ২৬ সম্মেলনকে সফল করার এখনো সময় আছে এবং এটা আমাদের এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য খুবই জরুরি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এবং কাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশের ভাইস-চেয়ার ওয়াসেকা আয়েশা খান বলেন, দুষণকারী দেশগুলো ন্যাশনাল ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন-এনডিসি পরিকল্পনা প্রদানে সংর্কীন ভূমিকা পালন করছে। নবায়নযোগ্য জ¦ালানী নিয়ে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশের অনেক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্বেও নবায়নযোগ্য জ¦ালানীর প্রসারে উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করছে। জলবায়ু সংকটের কারনে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশে^র সবদেশই কম-বেশি সমস্যার মুখে। তবে দূষণকারী রাষ্ট্রগুলো তাদের কার্বণ নির্গমণ হ্রাসের লমাত্রা এবং প্রতিশ্রুতি অর্থায়ণ নিশ্চিত করছে না। ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তি হলেও ৫ বছর পেরিয়ে গেছে। ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিবছর ১শ বিলিয়ন ডলারের অঙ্গীকার পূরণ হয়নি। শূন্য কার্বনের এক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর যা প্রয়োজন হবে তার তুলনায় এই ১শ বিলিয়ন ডলার যৎসামান্য, বেশ অপ্রতুল। এজন্য তরুণ সম্প্রদায়কে আরো বেশি অ্যাক্টিভিজম করতে হবে যাতে তাদেও ভবিষ্যত এবং বর্তমান সুরতি করা যায়।
ওয়াসেকা আয়েশা খান এমপি আরো বলেন, নবায়নযোগ্য জ¦ালানী সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর দেখাশোনার জন্য সংসদীয় কমিটি কাজ করছে। নবায়নযোগ্য জ¦ালানী প্রকল্প গ্রহণে জমি সংকট মোকাবিলায় নতুন নতুন ত্রে বের করা হচ্ছে। উপকূলজুড়ে তৈরিকৃত বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্যারাবন পুনরুজ্জীবিত করবে। আর এটি আমাদের বদলে যাওয়া সমুদ্রতট-বেলাভূমিকে স্থিতিশীল এবং উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরতি করতে সাহায্য করবে। প্রযুক্তি হস্তান্তরকে খুব গুরুত্বপুর্ন ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবুজ প্রযুক্তির হস্তান্তর ছাড়া আমাদের জ¦ালানী রুপান্তর কঠিন হয়ে যাবে। শিল্পোন্নত দেশগুলো প্রযুক্তিতে এগিয়ে। তাই তাদেরকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রযুক্তি হস্তান্তরে এগিয়ে আসতে হবে। বায়োগ্যাসের মত জৈব জ¦ালানীর আরো প্রসারসহ জ¦ালানী ও বিদ্যুতের অপচয় রোধে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতার উপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। ইউরোপিয়ান কাইমেট ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি লিড মনোয়ার মোস্তফা বলেন, এক সময়ে ভাবা হত যে কার্বন নির্গমণ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু প্রযুক্তির কল্যাণে এখন এ বিষয় প্রতিষ্ঠিত কার্বন নির্গমণকে কমিয়েও উন্নয়নকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব। গত দশকে বিশ^জুড়ে নবায়নযোগ্য জ¦ালানীর দাম ৮৩ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে ফসিল ফুয়েলের দাম বেড়ে গেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর ব্যয়বহুল নয়। সরকার এখন নিজেও কয়লা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এ েেত্র প্রযুক্তি গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা পালন করছে। তবে কয়লার বদলে এলএনজি গ্যাস টেকসই বিকল্প হবে না বরং অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ভবিষ্যত গন্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাথমিক জ্বালানি এবং বিদ্যুত আমাদানীতে আমরা পাশ্ববর্তী দেশগুলোর উপর আমরা নির্ভরশীল। ৯০ ভাগ প্রাথমিক জ্বালানি নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আমাদের জ্বালানি সুরা ও স্বাবভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হবে। স্থায়ীত্বশীলতা, মানুষের জীবনযাত্রার মানোয়নন্ন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আমাদের প্রধান গুরুত্বের জায়গা হওয়া উচিত। বায়ু দুষনের কারনে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এটি এখন করোনার চেয়ে ভয়ংকর। শুধু আইন করলেই হবেনা। সরকারি এবং বেসরকারি খাতের কারিগরি দতা অর্জন জরুরী। আর এ ল্েয তরুণ ও ছাত্র সমাজের জোড়ালো কন্ঠে আওয়াজ তোলা উচিত বলে তিনি মনে করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জির সহকারি অধ্যাপক ড. এস. এম. নাসিফ শামস নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে আরো বেশি গবেষণার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
কাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশের সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি এমপি বলেন, উপকূল অঞ্চল থেকে উত্তর অঞ্চল সবজায়গায় জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বিদ্যমান। যেনতেন ভাবে উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ এবং সঠিকভাবে সংরণ বা দেখভাল না করায় অনেক জনপদের মানুষ কষ্টের মধ্যে রয়েছে । এছাড়া যৌথ নদী ও পানি ব্যবস্থপনায় প্রতিবেশি দেশ ভারতের সাথে সর্ম্পক উন্নয়ন করার উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। সংসদ সদস্যদের সাথে তরুণরা যেভাবে কাজ করছে এর মাধ্যমে একদিন জলবায়ু সুবিচার প্রতিষ্ঠা পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশের চেয়ারপার্সন তানভীর শাকিল জয় এমপি বলেছেন, সংসদ সদস্যদের জলবায়ু নেটওয়ার্ক তৃণমূলে জলবায়ু প্রকল্পে পরিবীনে যুক্ত করা এবং জাতীয় পর্যায়ে নীতি সংস্কারে একসাথে কাজ করছে। কপ২৬ সম্মেলনকে ঘিরে তরুণদের সাথে দেশের চারটি অঞ্চলে এক যৌথ মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষ ও অংশীজন এবং প্রশাসনের সাথে আলোচনা হয়েছে। পরিদর্শন লব্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের পাশাপাশি আসন্ন জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৬ সম্মেলনে তৃণমূলের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরা হবে। এ সম্মেলনে (কপ২৬) বাংলাদেশের সমস্যা তুলে ধরে জলবায়ু তিগ্রস্তদের জন্য সুবিচার আদায়ের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here