আপিল নিষ্পত্তির আগেই ‘ ফাঁসি’ কার্যকরের ঘটনায় যশোর কারাগারে তোলপাড় \ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো মূল রহস্য

0
133

স্টাফ রিপোর্টার:‘আপিল নিষ্পত্তির আগেই যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে’-এমন ঘটনায় জানাগেলো লিভ টু জেল পিটিশনের রায় হাতে পেয়েই ফাঁসি কার্যকর করেছে কারা কর্তৃপক্ষ, আসামি পক্ষের করা আপিলের বিষয়কে দেওয়া হয়নি গুরুত্ব ।
২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর যশোর কারাগারে চুয়াডাঙ্গা জেলার মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার মেম্বর হত্যা মামলায় দুই আসামি পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা মোকিম ও ঝড়–র ফাঁসি কার্যকর হয়। কারাকর্তৃপক্ষ আইনগত সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মোকিম ও ঝড়–র ফাঁসি কার্যকর করলেও এখন বেরিয়ে আসছে তাদের দুর্বলতা। কারা কর্তৃপক্ষ নিজেদের লিভ টু জেল পিটিশনের রায় এবং রাষ্ট্রপতির আদেশ হাতে পেয়ে পরবর্তী সকল নিয়ম মেনে ফাঁসি কার্যকর করে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে আসামির করা আপিলের রায়কে গুরুত্ব দেয়নি। এদিকে এ রিপোর্ট প্রকাশ হলে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে দীর্ঘক্ষন কথা বলে জানা যায় ঘটনার মূলরহস্য। কারাকর্তৃপক্ষ দৈনিক মানবজমিনকে জানান, নি¤œ আদালতে আসামির ফাঁসির রায় হলে সাতদিনের মধ্যে কারাকর্তৃপক্ষ আসামীদের হয়ে উচ্চ আদালতে মামলার সকল কাগজপত্রসহ আপিল করে, রায় পরিবর্তন চেয়ে। একে বলে জেল পিটিশন। আসামি চাইলে সেও করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে জেলকর্তৃপক্ষের সাথে আসামিরাও আপিল করেন। হাইকোর্টে ২০১৩ সালে ৭ ও ৮ জুলাই দুইটি আপিলের শুনানী হয়। হাইকোর্ট দু’পক্ষের আপিল নিষ্পত্তির পর আসামিদের মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল রাখে । এবার কারাকর্তৃপক্ষ ও আসামিরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। কারাকর্তৃপক্ষের ভাষায় একে বলে লিভ টু জেল পিটিশন। সুপ্রিম কোর্টে ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর শুধু লিভ টু জেল পিটিশনের শুনানী হয়। ঐসময় কোন কারনে আসামি পক্ষের করা আপিল কাগজের ভিড়ে ফাইলের তলায় পড়ে যায়। ফলে ওই আপিলের কোন শুনানী হয়নি সুপ্রিম কোর্টে। সুপ্রিম কোর্টের লিভ টু জেল পিটিশনের রায় হয় ২০১৭ সালের ২৮ জুন। ২০১৭ সালের ২ জুলাই সহকারি রেজিস্টার আবু তাহের স্বাক্ষরিত রায়ের কপি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌছায় একই বছরের ৭ জুলাই। ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষার আবেদন করে আসামি পক্ষ। ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সহকারী সচিব মোহাম্মদ আলী স্বাক্ষতির এক পত্রে আবেদন নামঞ্জুরের বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। রায় হাতে পেয়ে সমস্ত নিয়ম কানুন মেনে ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর আসামীদের ফাঁসি কার্যকর করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কতৃপক্ষ। তখন জেলর ছিলেন আবু তালেব। সে সময় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ আসামিদের সুপ্রিম কোর্টে করা আপিলের কোন খোঁজখবর করেনি। জানতে চাইলে বর্তমান জেলর তুহিন কান্তি খান বলেন, এমন খবরে কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে আমরা দেখতে পায়, সুপ্রিমকোর্টে করা আসামি পক্ষের আপিলের রায়ের কপি নেই। বিষয়টি কারাকর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা কিনা জানতে চাইলে জেলর বলেন, হাইকোর্ট যখন দুটি আপিলেই ফাঁিস বহাল রেখেছে আবার সুপ্রিম কোর্ট লিভ টু জেল পিটিশনে ফাঁসি বহাল রেখেছে তখন আসামির করা আপিলের কপির প্রয়োজন পড়ে না। তবে মানবিকতার দিক থেকে তৎকালীন কারা কর্তৃপক্ষের সুপ্রিম কোর্টের আপিলের রায় দেখা উচিত ছিল। জানতে চাইলে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সেই সময়ের জেলর আবু তালেবের ০১৭১১৩০১৩২৪ নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। আবু তালেব বর্তমানে নাটোর কারাগারে জেলরের দায়িত্বে আছেন। তবে এ ব্যাপারে খুলনা বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি-প্রিজন) মো. ছগির মিয়া সাংবাদিকদের জানান, ঘটনাটি কারাকর্তৃপক্ষের বিষয় নয়। বিষয়টি মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের এ্যাপিলেট ডিভিশনের। কারণ কারাকর্তৃপক্ষ তথা সরকার পক্ষ ও আসামী পক্ষ উভয়ই সুপ্রিম কোর্টে রায় পরিবর্তন বা স্থগিত বা বাতিলের দাবিতে আপিল করে। তার আগে উভয় পক্ষই হাইকোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্ট যখন দুটি আপিলেই ফাঁিস বহাল রেখেছে আবার সুপ্রিম কোর্ট লিভ টু জেল পিটিশনে ফাঁসি বহাল রেখেছে তখন আসামির করা আপিলের রায়ের কপির প্রয়োজন পড়ে না। তবে মানবিক কারনে বিষয়টি একটু খোঁজ করা দরকার ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের মৃত রবকুল মন্ডলের মেঝো ছেলে মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার হোসেনকে ১৯৯৪ সালের ২৮ জুন গ্রামের বাদল সর্দ্দারের বাড়িতে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির কতিপয় চরমপন্থি কুপিয়ে হত্যা করে। ওই দিন নিহতের ভাই মুক্তিযোদ্ধা অহিম উদ্দীন বাদী হয়ে আলমডাঙ্গা থানায় ২১ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ চৌদ্দ বছর পর ২০০৮ সালের ১৭ এপ্রিল এ হত্যা মামলার রায় ঘোষিত হয়। রায়ে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির দুই আঞ্চলিক নেতা দুর্লভপুরের মৃত মুরাদ আলীর ছেলে আব্দুল মোকিম ও একই গ্রামের মৃত আকছেদ আলীর ছেলে ঝড়ুসহ ৩ আসামিকে মৃত্যুদ-াদেশ এবং দুর্লভপুরের মৃত কুদরত আলীর ছেলে আমিরুল ইসলাম ও একই গ্রামের আবু বক্করের ছেলে হিয়াসহ ২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ দেওয়া হয়। বাকি ১৬ আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। মামলার রায় ঘোষণার পর উচ্চ আদালতে আসামীর স্বজনরা আপিল করেন। হাই কোর্টের আপিল বিভাগে ওই আবেদনের শুনানী শেষে বিচারিক আদালতের দেওয়া ফাঁসির দন্ডাদেশপ্রাপ্ত এক আসামি ও যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশপ্রাপ্ত ২ জন আসামি আমিরুল ইসলাম ও হিয়ার দ-াদেশ মওকুফ করা হয়। মোকিম ও ঝড়–র ফাঁসির আদেশ বহাল থাকে। সুপ্রিম কোর্টের এ্যাপিলেট ডিভিশনেও বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখা হয়। পরে রাষ্ট্রপতির কাছে করা আসামীদের প্রাণভিক্ষার আবেদনও নামঞ্জুর হয়। এরপর ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর রাত পৌনে ১২টায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে মোকিম ও ঝড়–র ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here