বিজয়ের স্মৃতি কথা-জাহিদ হাসান টুকুন

0
70

অনেক স্মৃতি যা আজো স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে। স্মৃতি জাগানিয়া সেই সব দিনগুলো পঞ্জিকার পাতা ওল্টানোর সাথে সাথে পুরনো বা মলিন হয়ে যায় না। চির ভাস্বর হয়ে দীপ্তমান সূর্যের মতন দেদ্বীপ্যমান হয়ে থাকে। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মনের গভীর থেকে উঁকি দিয়ে ওঠে অনেক কথা। যা স্মৃতির মণি কোঠায় সযত্নে রক্ষিত আছে।
যশোরে ২৬ মার্চ ক্যান্টনমেন্টে গোলাগুলি শুরু হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯ মাসের ৮ মাসই ঢাকায় ছিলাম আমরা। সে অনেক কথা যা লিখবো স্বাধীনতা দিবসে।
বিজয়ের কথা। কোনটা রেখে কোনটা বলি! মনে পড়ে অনেক কথা। ৭১ এর নভেম্বর ডিসেম্বরে সারা মাস ধরে যুদ্ধ চলছে মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর সাথে বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করছে। গেরিলা যুদ্ধ হচ্ছে দেশের মধ্য অনেক জায়গায়। প্রতিদিন কাবু হানাদার বাহিনি। আমাদের কাজ তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবর আর এম আর আখতার মুকুলের চরমপত্র শোনা।
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে যশোরসহ বহু জায়গা মুক্ত হওয়া শুরু হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা সেইসব থানা জেলা দখলে নেওয়া শুরু করেছে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে ঢাকার আকাশে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিমান মিগ-২১ উড়তে শুরু করল। আকাশ থেকে আকাশ ও ভুমিতে তাদের এই আক্রমণ দেখতে আমরা সারাদিনই ঢাকার বাড়ির ছাদে থাকতাম। ছাদে দেখা যেতো মিগ-২১। ঢাকার আকশে ঘুরে ঘুরে ঢাকা বিমান বন্দরের উপর আঘাত হানছিল। আঘাত করেই আবার আকাশে উড়ছিল। মাঝে মাঝে পাকিস্তানের স্যাভার জেট বিমান আকাশে উঠে মিগ-২১কে ধাওয়া দিচ্ছিল। কিন্তু অদ্ভুত দৃশ্য মিগের ধারে কাছেও স্যাভার জেট বিমান যেতে পারছিলনা। স্পষ্ট মনে আছে মিগ-২১ এর কাছে স্যাভার জেট বিমানকে মনে হচ্ছিল একটি নষ্ট জাতীয় বিমান। যে বিমান দিয়ে মিগ-২১ কে কোন মতেই ঠেকানো সম্ভব নয়।
এর মধ্যে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর মোনেম খানকে গুলি করে হত্যা করল। এই হত্যা ঘটনায় পাকিস্তানের মনোবল প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে এলো। ৩রা ডিসেম্বর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রিরা গান্ধি পাকিস্তানের সাথে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। সাথে সাথে পাকিস্তানের তৎকালিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও যুদ্ধ ঘোষণা করলেন।তার পরই শুরু হলো যুদ্ধের গতি বৃদ্ধি। ঢাকার আকাশে দখল করে রেখেছিল ভারতীয় বিমান বাহিনী। পাকিস্তান বাহিনী আকাশে যেতেই পারছেনা। ১৩ অথবা ১৪ই ডিসেম্বরের দুপুরে ভারতীয় একটি যুদ্ধ বিমান ঢাকার আকাশে খুব নিচে দিয়ে ঘুরছে হঠাৎ পাকিস্তানের স্যাভারজেট বিমানের কাছাকাছি হলে স্যাভার জেট বিমান থেকে মিগ লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে মিগটি আকাশেই বিষ্ফোরিত হয়। আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। দেখলাম নীল একটা বিশাল প্যরাসুট খুলে গেল তার মধ্যে ভারতীয় বিমান সেনা আকাশ থেকে নামছে। সে অদ্ভুত একটি দৃশ্য। পাকিস্তানের হেলিকপ্টার বিমান সেনাকে উদ্ধার করার জন্য বিমান সেনার সাথে সাথে উড়ছে। রাতে পাকিস্তান টেলিভিশনের খবরে দেখলাম ঐ বিমান সেনা গ্রেফতার হয়েছেন। তার হাতে ব্যান্ডেজ করা মাথা ব্যান্ডেজ করা। খবরে বলছে ঐ বিমান সেনা কর্মকর্তারা মহম্মদপুরে নেমেছে। মহম্মদপুরের বিহারীরা বিমান সেনাকে মারধোর করেছে পরে উদ্ধার হয়েছে। অদ্ভুত সুন্দর বিমান সেনা কর্মকর্তা লম্বা সুদর্শন যুবক।
এই ঘটনার পর ভারতীয় বিমান বাহিনীর অন্যান্য বিমান গুলো ক্ষিপ্ত হয়ে স্যাভারজেটের পিছনে তাড়া করলে স্যাভার জেটটিও বিস্ফোরিত হয়। ঢাকার আকাশে আর কোন পাকিস্তানি বিমান ছিলনা। ঢাকার আকাশে শুধুই ভারতীয় বিমান উড়ছে। আমার ফুফাতো ভাই চুন্নু ভাই রেডিও থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও পাকিস্তান সেনা বাহিনীর আত্মসমর্পণের কথা শুনে সকলকে জানালো। ১৬ তারিখে রেসকোর্স ময়দানে ভারতীয় হেলিকপ্টার আসবে এবং আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হবে।
এর মধ্যে হঠাৎ দেখি শত শত সৈনিক আজিমপুর পিলখানায় ঢুকছে প্রত্যেকের হাতে একটি করে অস্ত্র ঘাড়ে বেডিং লাইন দিয়ে পিলখানা ই পি আর এর হেড কোয়ার্টারে যাচ্ছে। আমরা তখন আজিমপুর থাকি। তাই আমি ও আমার বন্ধুরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছি। লোকজন সব দূর থেকে এই দৃশ্য দেখছে। আমাদের থেকে বড় কিছু সাহসী যুবক ওদের জিজ্ঞাসা করলো তোমরা চলে যাচ্ছো কেন? ওদের মধ্যে একজন ভাঙ্গা বাংলায় বলল তোমাদের জয় বাংলা হয়ে গেছে। শোনার সাথে সাথে সকলে সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো জয় বাংলা। লিখতে লিখতে মনের পর্দায় ভেসে উঠছে সেই দৃশ্য। আবাল বৃদ্ধ বণিতা সকলে একই শ্লোগান দিচ্ছে জয় বাংলা জয় বাংলা জয় বাংলা। বলতে বলতে সকলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছে।
আমরা চলে গেলাম নিউ মার্কেটের দিকে। ওখানে দেখলাম মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বিশাল দল আসছে হেঁটে হেঁটে। সকলের হাতে অস্ত্র। সামনে যিনি আছেন তিনি লম্বা চওড়া, মুখ ভর্তি চাপ দাড়ি। অত্যাধুনিক একটি প্যান্ট সার্ট পরা, সমস্ত প্যান্টে পকেট কোমরে অস্ত্র ঘাড়ে একটা বড় অস্ত্র। সকলে তার সাথে হাত মিলাচ্ছে। আমরাও ছুটে গেলাম হাত মিলাতে। হাত মিলালাম। উনি আমাদের গাল টিপে আদর করে দিলেন। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। নাম শুনলাম ওনার। নাম খসরু (পরে যিনি কয়েকটি মুক্তিযুদ্ধে সিনেমা করেছেন।)
এই প্রথম দেখলাম মুক্তিযোদ্ধা। শুধু মনে হচ্ছিল বারবার হাত মিলাই। সমস্ত ভারতীয় সামরিক বাহিনীর জোয়ানরা গাড়িতে ঢাকায় ঢুকছে আর ঢাকাবাসী জয় বাংলা বলে তাদের স্বাগত জানাচ্ছে। আমরা কয়েকটা গাড়িতে উঠলাম ভারতীয় জোয়ানরা ঢাকাবাসীর সাথে মোলাকাত করছে।
হাত মিলাচ্ছে। সে দৃশ্য আজ স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। আর ঐ দিনের কথা মনে হলে আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই। ১৬ তারিখ সকালে আমরা ৯জন বন্ধু রেসকোর্স ময়দানের দিকে গেলাম দেখার জন্য। কিন্তু অনেক আগে গিয়েছিলাম বলে কিছুই দেখতে পেলাম না। আর ওখানে এতো ভিড় ছিল যে দেখতে পারছিলাম না। ওখান থেকে চলে গেলাম সোজা তেজগাও বিমান বন্দরে। খুবই রেসট্রিকশন। কাউকে ঢুকতে দিচ্ছেনা। ভারতীয় বাহিনী গার্ড দিচ্ছে। আমাদের মধ্যে এক বন্ধু ছিল। নাম তার আনোয়ার ও ভাল ইংরাজি বলতো। ও ভারতীয় এক শিখ মেজরকে বুঝালো আমরা একটু ভেতরে যাবো। তিনি বললেন যাওয়া যাবেনা। কারণ বিমানবন্দরে পাকা জায়গা ছাড়া মাটিতে অনেক মাইন পোতা আছে।ওখানে মাইন তোলার কাজ চলছে। যাওয়া ঝুকি । আমরা নাছড় বান্দার মতো উল্টা অনুরোধ করতে লাগলাম। আর মাইনের ভয়াবহতা সম্পর্কে এত ধারণাও ছিলনা। মনে ছিল অদম্য সাহস আর আগ্রহ।
ঢুকতে দিল আমাদের। প্রথমে বিমানগুলি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ভারতীয় বিমান বেশি। একটি বিমানে বাংলাদেশের পতাকা খচিত। আমাদের কাংখিত পতাকা।
ভারতীয় বিমানের পাশে একজন কাপ্টেন দাঁড়িয়ে আছেন। ওনাকে দেখেই চিনে ফেললাম। উনি হচ্ছে সেই মিগ-২১ এর পাইলট যিনি প্যারাসুটে নেমেছিলেন। ওনাকে দেখলাম উনি আছেন সাথে আরো পাইলটরা আছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here