যশোরে ২ মাসে ৭ খুন

0
16

স্টাফ রিপোর্টার : যশোরে একের পর এক খুনের ঘটনায় উৎকণ্ঠা বাড়ছে সর্ব শ্রেনীর মানুষের মধ্যে। তুচ্ছ ঘটনায় এবং স্থানীয় আধিপত্য দ্বন্দ্বে হত্যা গুলো ঘটছে। যশোর সদর উপজেলায় চিহ্নিত প্রতিপ ও পরিচিতরাই খুন গুলো করেছে। গত দুই মাসে সাতটি খুন হয়েছে। চলতি মাসের ৮ জানুয়ারি প্রকাশ্য দিবালোকে হিজড়া খুন ও একদিন পর ১০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অভয়নগর উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নের নব নির্বাচিত মেম্বর উত্তম সরকারকে গুলি করে হত্যায় শঙ্কা আরও বেড়েছে। ক্রাইম ঘটিয়ে সহজে পালিয়ে যাওয়া যাবে এমন ধারণা থেকেই অপরাধীরা এসব খুনের ঘটনা একের পর এক ঘটিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী ও নিহতদের স্বজনদের দাবি খুনীরা বিভিন্ন প্রভাবশালী শেল্টারে থেকে একের পর এক খুন করছে। পুলিশি টহল বৃদ্ধি, সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের নতুন তালিকা করে আটকের দাবি তাদের। একই সাথে ভূক্তভোগী পরিবারের লোকজন এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চ মহলের দ্রুত হস্তপে কামনা করেছেন। গত বছর ২০২১ সালের শেষ দুই মাস নভেম্বর ও ডিসেম্বরে পাঁচ খুন হয়েছে যশোরে। চলতি নতুন বছর ২০২২ সালের প্রথম মাস জানুয়ারির শুরুতেই যশোর সদর উপজেলায় আরও একটি খুনর হয়েছে। কলেজ ছাত্র, স্কুল ছাত্র, ইজিবাইক চালক, দোকানী, রাজনৈতিক ঘরানার যুবক এবং হিজড়া খুনে আইন শৃঙ্খলা ও অপরাধ প্রবনতা নিয়ে রীতিমত শঙ্কিত সাধারণ মানুষ। এসব সাধারন নির্ভেজাল গোষ্ঠির মানুষ। গত ৮ জানুয়ারি প্রকাশ্য দিবালোকে আধিপত্য ও পূর্ব শত্রুতার কারণে ভাড়াটে দুর্বৃত্তদের ব্যবহার করে খুন করা হয়েছে ধর্মতলা এলাকায় বসবাসকারী আব্দুল কাদের ওরফে লাভলী হিজড়াকে। তিনি যশোরের বেজপাড়ার করিম মিস্ত্রীর পুত্র। হিজড়া লাভলী খুনের ঘটনায় জেলা গোয়েন্দা শাখা ডিবি এখনো পর্যন্ত চার জনকে আটক ও তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, পাঁচ রাউন্ড গুলি, একটি বার্মিজ চাকু, একটি করাত ও ২টি মোবাইল ফোনসেট উদ্ধার করেছে। আসামী আটক ও অস্ত্র উদ্ধারের পর তথ্য মিলেছে, হিজড়ার আধিপত্য বিস্তার ও টাকা লেনদেনকে কেন্দ্র করে অপর হিজড়া সেলিনা ও নাজমার সাথে আব্দুল কাদের ওরফে লাভলীর মধ্যে অভ্যন্তরীন বিরোধ চলছিল। নাজমা ও সেলিনাসহ তাদের সহযোগী আরও কয়েকজন লাভলীকে খুন করার পরিকল্পনা করে। ৮ জানুয়ারি সকালে লাভলী বাচ্চা নাচাতে কায়েমকোলা বাজারের দিকে যান। এসময় তার সহযোগী হিসেবে নাজমা ও সেলিনা ছিল। নাজমা ও সেলিনার পূর্ব পরিকল্পনায় ওইদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে একটি ইজিবাইকে করে তারা রওনা দেয়। হালসা গ্রামের মাঠে একটি ব্রিজের উপর পৌছানো মাত্র নাজমা, সেলিনা, শাকিল পারভেজ ও মেহেদী হাসানসহ অজ্ঞাতনামা আরো কয়েকজনে তাদের পথরোধ করে। এরপর প্রথমে পিস্তল দিয়ে লাভলীকে ল্য করে পরপর দুইটি গুলি করে। পিস্তলের গুলি ল্যভ্রষ্ট হলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে লাভলীকে হত্যা করা হয় প্রকাশ্য দিবালোকে। সেখানে ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে সদর উপজেলার দোগাছিয়া গ্রামের জিয়াউর রহমানের পুত্র শাকিল পারভেজ (২১), ঝাউদিয়া গ্রামের শাহাজুল বিশ্বাসের পুত্র মেহেদী হাসান (১৯) আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। অভয়নগরে নবনির্বাচিত ইউপি মেম্বার উত্তম সরকার হত্যায় মামলা হয়েছে। এই খুনের পর এলাকাবাসীর মধ্যে এখন চরম আতংক বিরাজ করছে। পুলিশের একাধিক টিম রহস্য উদঘাটন ও হত্যাকারীদের আটকে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। খুন আতঙ্ক জেঁকে বসেছে জনপ্রতিনিধিদের মাঝে। সোমবার (১০ জানুয়ারি) রাত ৮টার দিকে সুন্দলী ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের নব নির্বাচিত মেম্বর উত্তম সরকার হরিশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। তিনি হরিশপুর গ্রামের মৃত প্রশান্ত সরকারের পুত্র। ২৬ ডিসেম্বর ইউপি নির্বাচনে ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন তিনি। সুন্দলী ইউনিয়নের হরিশপুর গ্রামে নিহত উত্তম সরকারের বাড়িতে এখনো শত শত মানুষ ভিড় করেছেন। টিনের চালা দেয়া বাড়িতে বসে নিহতের মা, স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান এখনো অঝোরে কাঁদছে। নিহতের মা শেফালী সরকার জানান, ইউপি নির্বাচন করায় তার পুত্রকে খুন হতে হয়েছে। এখন উত্তমের দুই শিশুর কী হবে সেই প্রশ্ন সকল সামাজিক মানুষের কাছে মা হিসেবে তার। ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বিকাশ রায় কপিল বলেন, ঘটনার পর থেকে গ্রামবাসীর মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। তবে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। গত ১৯ ডিসেম্বর দুপুরে যশোরের শংকরপুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা সাব্বির হোসেন নামে এক চা দোকানীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। তার পূর্ব পরিচিত উঠতি সন্ত্রাসীরা তাকে কৌশলে ডেকে হত্যা করে। ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় শহরতলী বকচর হুঁশতলা কবরস্থানপাড়ার মৃত লিটু সরদারের পুত্র রাকিব সরদারকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। বকচর মোড়ে ভাঙাড়ির দোকানের কর্মচারী রাকিব এদিন সন্ধ্যায় মাঠপাড়ার শহিদুল ইসলামের চটপটির দোকানে চটপটি খেতে যান। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে রাকিব বন্ধুদের সাথে চটপটি খাচ্ছিল। এ সময় এলাকার পরিচিতরা আধিপত্য দ্বন্দ্বে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। ১৭ নভেম্বর রাত সাড়ে ১০ টায় কবরস্থান এলাকার নরায়ণ চন্দ্র ঘোষের চায়ের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় আব্দুল হামিদের পুত্র সাবেক সৈনিক ও তাঁতীলীগ নেতা কাকনকে। গত ৯ নভেম্বর রাতে শহরতলী সুলতানপুরের মুজাদ্দুজ্জামানের পুত্র কলেজ ছাত্র ও ইজিবাইক চালক আব্দুল্লাহকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। ইজিবাইকটি ছিনতাইয়ের জন্যই ওই খুন। খুনীদের মধ্যে একজন নিহতের অতি পরিচিত। পুলিশি তদন্ত ও খোঁজ খবরে তথ্য মতে হত্যা গুলো ঘটেছে ছোট খাটো পূর্ব ঘটনা নিয়ে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও তুচ্ছ স্বার্থ সংক্রান্ত বিষয়ে। উঠতি দুর্বৃত্ত ও অস্ত্রধারীরা একের পর এক এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকজনের দাবি জড়িতরা এলাকার। তারা রাজনৈতিক সেল্টারে চলে। অস্ত্রধারী হওয়ায় ওই সব চক্রকে মানুষ ভয়ও পায়। হত্যাকান্ড ঘটালেও তারা যে কী অপরাধ করছে সে বোধও তাদের নেই। এছাড়া উঠতি সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের নতুন তালিকা করে আটকের দাবি উঠেছে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের প থেকে। গেল কয়েক বছরে যশোরের বিভিন্ন স্পটে একাধিক গ্রুপ করে উঠতি সন্ত্রাসীরা মাথা চাড়া দিয়েছে। যারা তুচ্ছ একটি ইজবাইক, ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকায়, কিংবা নেপথ্যে থাকা কোনো রাজনৈতিক নেতার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এ ব্যাপারে জরুরি ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে পুলিশকে কৌশলী কার্যক্রম হাতে নেয়ার ব্যাপারে কথা বলেছেন ভূক্তভোগী মানুষ। এ ব্যাপারে যশোর কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ তাজুল ইসলাম জানান, হত্যা গুলো ঘটছে বিছিন্নভাবে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে অপরাধী চক্র এসব অপরাধ ঘটাচ্ছে। পুলিশি টহল জোরদার রয়েছে। এছাড়া হত্যা গুলোর ব্যাপারে যত্ন সহকারে তদন্ত হয়েছে বা হচ্ছে। অধিকাংশ হত্যার রহস্য উন্মোচন হয়েছে। আসামি আটক করে চালান দেয়া হয়েছে। কয়েকটি হত্যা মামলার আসামিরা আত্মগোপনে আছে। সোর্স লাগিয়ে তাদের আটকের চেষ্টা চলছে। তবে হত্যাকান্ড কিংবা অপরাধ যাতে না ঘটে সেই আন্তরিক প্রচেষ্টা রয়েছে পুলিশের। এ ব্যাপারে যশোর জেলা গোয়েন্দা শাখার অফিসার ইনচার্জ রুপন কুমার সরকার জানান, গোয়েন্দা শাখা অপরাধ প্রতিরোধে প্রত্য ও পরো কাজ করে যাচ্ছে। টহল জোরদার ও নিয়মিত রয়েছে। এছাড়া ঘটে যাওয়া হত্যা গুলোতে দ্রুততম সময়ে অ্যাকশানে রহস্য উন্মোচনসহ জড়িতদের শনাক্ত ও আটক করা হয়েছে। এছাড়া অপরাধ দমনে গোয়েন্দা শাখা আরও আন্তরিক কাজ করতে উদ্যেগী হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here